আজকেও পৃথিবী ছাড়তে চাই | Bengali social story


কলমে:  দিব্যেন্দু সরকার ( ছোট গল্প ) 

                          (১)

"রিসার্চ পেপারের দিকে অনেকক্ষন তাঁকিয়ে পড়তে বসার ইচ্ছে জাগানোর চেষ্টা সকাল থেকেই করে যাচ্ছি। কেয়েক দিন ধরে আর মন বসছেনা পড়তে।
শুধু পড়তে না,কিছুতেই আর মন থাকেনা। ছোটোবেলা থেকে পড়ার প্রতি একটা ঝোঁক ছিলো, পড়ে সেটা নেশার মতো তাড়িয়ে বেরিয়েছে।
বাড়ী ছেড়েছি অনেক তাড়াতাড়ি। তারপর শিলিগুড়ি-পুনে-আবার শিলিগুঁড়ি।
একটা লম্বা সময় "শিলিগুঁড়ি ইন্টিটিউট অফ টেকনোলজি"-তে প্রফেসর হয়ে চাকরি।
কলেজের পলিটিক্স টা যদি অসঝ্য না হয়ে উঠতো তবে হয়তো এখানেই নদী জলপ্রপাতের মতো পড়ে স্থির হয়ে যেতো,কিন্তু নদী কিছুতেই থামবে না,সে চলতে চায়।
আবার একটা লড়াই। ত্রিপুরা NIT-তে PHD করতে গিয়ে অনেকগুলো রাজ্য ছুটতে হয়েছে।
শুধু ছুটে গেছি। দৌঁড়ে গেছি। লম্বা এক দৌঁড়। 
আর কি বলবো প্রত্যুষ দা ? অনন্যা এক দীর্ঘশ্বাসে প্রত্যুষ কে ফোনে জানালো।"
--তাহলে কবে যাচ্ছ?
অনন্যা অবাক হওয়া কণ্ঠে বলল,"কোথায়?"।
--ওই যে সব সময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চাও বলো। ইচ্ছে নেই আর?
অনন্যা হাসলো। না-ছেড়ে যাবো প্রত্যুষ দা। এ ইচ্ছে চলে গেলে অনেকদিন আগেই চলে যেতো। ছেড়ে যাবো।
-- তোমার হাসব্যান্ড ডাক্তার। তুমি ইঞ্জিনিয়ার, বাড়িতে দায়িত্ব কম, তোমার ছেড়ে যেতে ইচ্ছে কেনো? আমি আমার অগাধ অভিজ্ঞতা দিয়েও বুঝতে পারবোনা।
তবে একটা HELP করতে পারবো।
অনন্যা,অক্ষেয়ালি সুরে বললো,-কি HELP ?
--পৃথিবী ছাড়ার সময় আমি থাকবো।
অনন্যা হেসে উঠলো। এমন ভাবে হাসলো যেনো হাসতে চাচ্ছিলো। হাসতে-হাসতেই বললো,"ফোন রাখি প্রত্যুষ দা।"

প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে ভাগ্য জুড়ে থাকে সকলে ধরে নেয়, কিন্তু মেয়েদের বেলায় ভাগ্য-কে জুড়ে থাকতে হয় অনেক কিছুর সাথে। ভালো হাসব্যান্ড পাওয়াটা একটা ভাগ্য, যেনো খারাপটাই স্বাভাবিক ছিলো, ভালো বাড়ী, ভালো জায়গা, আরও কতো ভালো-র ভাগ্য থাকলে একটি মেয়ে পৃথিবীতে কাটিয়ে যেতে পারে।
কথাটা ভেবে অনন্যা হাসলো। কিছু ইচ্ছে আজকাল করেনা বলেই কি হাসি বেশি পাচ্ছে অনন্যার? এটা-কী তাচ্ছিল্যের হাসি। তাচ্ছিল্য কিসের ওপরে?
কোনো কিছুতে খামতি করেনি অনন্যা। স্বামী ডাক্তার। PHD না করলেও হতো, কিন্তু না-বাবার চোঁখ তাঁড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে অনন্যাকে। বাবার সেই চোঁখ ঘুমোতে দেয়না, ঘুমোতে-জেগে বাবার সেই ঘোলা চোঁখ দেখতে পায় অনন্যা। 

বাবা,স্কুল শিক্ষক। সম্মানের চাকরি,কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ভিটেমাটি ছেড়ে আসা একগাদা পেট ভরানোর জন্যে কারোর কাছেই যথেষ্ট হয়ে ওঠেনি সেই সম্মানের চাকরি। জ্যেঠু,কাকুদের নির্লজ্জতার ব্যাপারে না ভাবলেও যখন মনে পড়ে বাবাকে একার কাঁধে সবাইকে নিয়ে বৃহৎ সংসার টানার কাহিনী তখন যে স্যাক্রিফাইস এর রক্ত ঘাম হয়ে পড়েছিলো- সেই ঘাম, রক্তই তাড়িয়ে নিয়ে যায় অনন্যাকে।
বাবা স্বপ্ন দেখে গেছে ঘোলা চোঁখে। না খেয়ে দৌঁড়ে গেছে।
বোন জিনিয়া কেও স্যাক্রিফাইস কম করতে হয়নি। যদিও বোন পড়াশুনায় ওতো ভালো ছিলো না, কিন্তু খারাপ কি ছিলো? খারাপও ছিলো না, আরও একটু বোন পেতে পারতো, কিন্তু অনন্যা যেটা পারতো সেটা সবার কাছে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। 
আজকে অনন্যা দাঁড়াতে পারেনা। স্থির হতে পারেনা। ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ হতে-হতেই বাড়ির হাল ধরে নিয়েছিলো, তারপর থেকে নিঙড়ে গেছে নিজেকে।
রক্ত ঝরিয়েছে। সেই রক্তের ঝর্ণা আনন্দ দেয় অনন্যাকে।
বেঁচে যাচ্ছে বাবা, মা, আর বোনের জন্য।
ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রেখে দেওয়ার জন্যে।
অনন্যার কাছে বোন তাই বোন ছিলোনা, মেয়ে ছিলো।

                                   (২)


প্রত্যুষ আর অনন্যার কথা যেভাবে একটু বেড়েছিলো সেটা মনে পড়ছিলো প্রত্যুষের।
পরিচয় মাত্র ফেসবুক থেকে। অনন্যাকে বুঝতে শুরু করলো যেদিন ত্রিপুরা থেকে পৌঁছলো অনন্যা শিলিগুড়িতে।
ট্রেন-এ আসার সময় নিজের জীবনের কিছুটা ইতহাস তুলে ধরেছিলো।


হ্যালো-হ্যালো-প্রত্যুষ এর আগেও অনন্যাকে ফোনে ধারার চেষ্টা করেছে, এখন নয়টা বাজে, ট্রেন ঠিক সময় পৌঁছে গেছে  NJP স্টেশনে, একটু চিন্তা হচ্ছে তাই।
আবার ফোন করতে যাবে এমন সময় ফোন আসলো, প্রত্যুষ ফোনটা ধরলো,- "চিনে ঠিক মতো নামতে পেরেছো?"
--মানে, আমার জায়গা আমি চিনবোনা,বলে হাসলো অনন্যা।
প্রত্যুষ একটু হেসে,চোখ ছোটো তাই ভাবলাম যদি দেখতে না পাও"।
অনন্যা," আপনি কোথায়"? আর আমার এ চোঁখেও সব ধরা পরে।

প্রত্যুষ," আমি সকালে হসপিটালে চলে এসেছি, এখন হসপিটালেই আছি।
অনন্যা, "ভালোই হয়েছে, আমি পৌঁছচ্ছি।"
দু-দিন হলো অনন্যার শ্বশুর মশাই হসপিটালে ভর্তি হয়েছে। প্রত্যুষ আজকে এসেছে হসপিটালে, সে অনন্যার বন্ধু মাত্র, তাও  একটা সোশ্যাল সাইট এর  ধরে পরিচয় হয়েছিলো, কাজেই অনন্যার হাসব্যান্ড এর সাথে এখনো তেমন আলাপ-পরিচয় নেই যে কোনো কাজ নিয়ে হাসপাতালে দৌড়োদৌড়ি করবে। তবে অনন্যার স্বামীর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করে রেখেছে।
অনন্যার স্বামী নিজেই ডাক্তার, এই হাসপাতালের না হলেও উনি ডাক্তার হওয়াতে চিকিৎসার ব্যাপারে উনার হস্তক্ষেপ হাসপাতাল এবং যে ডাক্তার দেখছেন মেনে নিচ্ছেন।
প্রত্যুষ কার্যত একাই হাসপাতালে ঢোকার মুখে হাটাহাটি করছে, অবশ্য অনন্যার স্বামী ছাড়া আর কাউকে ওঁদের তরফ থেকে চোখেও পড়েনি প্রত্যুষের।
এরকমই সাতপাঁচ ভাবছিলো হঠাৎ প্রত্যুষ দেখলো অনন্যা ট্যাক্সি থেকে নামছে।
প্রত্যুষ এগিয়ে গেলো।
অনন্যা সহজাত একটু হাসি দিয়ে আসছি বলে ছুটে ঢুকে গেলো হাসপাতালের ভেতরে।
প্রত্যুষ-ও ভাবলো এবার ভেতরে বড়ো প্যাসেজ জুড়ে বসার জায়গায় গিয়ে একটু বসে, তাঁর-ও আসা অনেকক্ষন হয়েছে, পা একটু ব্যথা হচ্ছে।


প্রত্যুষ খেয়াল করছে অনন্যা আসার পড়ে থেকেই শশুর বাড়ীর লোক ভীড় করছে। আবহাওয়া কেমন বদলে গেছে। আজকে অনেকেই এসেছেন  এবং সবাই বেশ গম্ভীর মুখে দায়িত্ব নিচ্ছেন ।
প্রত্যুষ অনেকের কাছেই শুনছে যে তাঁরা আগের দু-দিন আসতে পারেননি, আজকেই আসতে পেরেছেন।
অনন্যা ডাক্তার বাবুদের কাছে যাতায়াত করছে, আবার মাঝেমধ্যে শাশুড়ি-মা'কেও দেখে যাচ্ছে।
আসা যাওয়ার সময় প্রত্যুষকেও যথাযতো খবর দিয়ে যাচ্ছে।
হাসপাতালে তিনটে ব্যাপার এসে পড়ে, প্রথম চিকিৎসা কেমন হচ্ছে, চিকিতসার জন্যে কি কি প্রয়োজন তা দেখা, দ্বিতীয় হলো বাড়ি র সঙ্গে হাসপাতালের যোগাযোগ রক্ষা করা। যেমন বাড়ী থেকে কি আনতে হবে, বা কিছু পাঠাতে হলে, তৃতীয়ত হলো, লোকবল রক্ষা করা।
অল্প একটু সময়ের মধ্যে তিনটে ব্যাপারে অনন্যা সামলে নিয়েছে। আত্মীয়রা বেশ নিশ্চিন্ত সেই কারণে।
অনন্যার শাশুড়ি-মা' এই কারণেই  শিলিগুড়িতে বোনের বাড়িতে উঠলেও গত দু-দিন হাসপাতালে আসতে পারেনি। আজকে অনন্যা আসায় উনি এসেছেন। উনি একটা ব্যাপারে অন্য দিনের থেকে একটু ভালো কারণ উনার স্বামীর খোঁজ উপস্থিত থেকেই নিতে পারছেন।
প্রত্যুষ অবাক হয়ে দেখছে মেয়েদের শক্তি-কে অবহেলা করার চেষ্টা বা অন্তত ভাবতে সে চায় কিন্তু যখন কোনো পরিস্থিতি আসে তখন সেই শক্তিকে মানতেই হয়।

প্রত্যুষ জানতো, অনন্যার শ্বশুড় বাড়ীর পরিচয়- সামাজিক, রাজনৈতিক সর্বত্র স্তরে, জলপাইগুড়ি শহরে চেনেনা এমন লোক হবে না। তাই সর্বস্তর থেকেই লোকের ভীড় হবে এটা আশা করেছিলো, কিন্তু সেটা যে আজকে বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারছে প্রত্যুষ।
অন্য কিছু নিয়ে অনন্যার স্বামী রণেন্দ্র দত্ত মহাশয়কে ভাবতে হচ্ছেনা জন্যে বাবার চিকিৎসা নিয়ে অনেক বেশি করে ভাবতে পারছেন।
অবশ্য সেটা যে শুধু মাত্র আজকেই না, এই সুবিধেটা যে রণেন্দ্র বাবুর অধিকারে দাঁড়িয়েছে সেটা ভালো করেই প্রত্যুষ বুঝতে পেরেছে।



এরপর আরও আট দিন অনন্যার শ্বশুড় মশাই লড়াই করেছিলেন। সেটা স্বাভাবিক ছিলো কারণ স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্ত ওনার শরীরে শেষ দিন পর্যন্ত লড়াইকে জীবিতো রেখেছিলো।
যেদিন সব লড়াই শেষ হলো সেদিন আবার প্রত্যুষ হাসপাতালে গিয়েছিলো দেখতে।
এই কয়েকদিন ফোনে তিনবেলা খবর নিতো।
অনন্যা যে কাউকে কিছু করতে দেবে না সেটা নতুন করে ভাবার দরকার ছিলোনা। আরো একটু অবাক করতে পারলো যখন প্রত্যুষ শেষ কাজগুলো দেখার সুযোগ পেলো।
সবকিছু শেষ করে শশুড় মশাইয়ের শরীর নিয়ে জলপাইগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে দুপুর হয়ে গেলো।
হাসপাতালে দু-টো মানুষ এর লড়াই দেখেছিলো প্রত্যুষ সে কয়েকদিন।


আবার দু-চার দিন কোনো কথাবার্তা হয়নি অনন্যার সাথে, ইচ্ছে করেই প্রত্যুষ ফোন করেনি।
প্রায় কয়েকদিন পড়ে ফোন আসলো অনন্যার।
কেমন আছেন?
প্রত্যুষ একটু হেসে,"এটা তো আমার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিলো।"
না, আমার খারাপ লাগছে,এতো করলেন  অথচো খবর নিতে পারিনি, অনন্যা একটু নিচু স্বরে আক্ষেপ করলো।
প্রত্যুষ বুঝলোনা সে কি করেছে," তারপর সব ঠিক আছে তো?"
অনন্যা বললো, এই সময় যে ভাবে যায় আর কি। আর স্যারকে বলেছি দুমাস পরে যাবো।
প্রত্যুষ বেশ জোরের সঙ্গে বললো," স্যার নিশ্চই বুঝবেন।"
অনন্যা একটু হেসে বললো,"হ্যা, হাসপাতালের সময়ও রিসার্চের কাজ সাবমিট করে গেছি। এখনও করে যাচ্ছি।
প্রত্যুষ-ও হাসলো,"বাহ দিয়ে যাও-দিয়ে যাও পৃথিবীকে নতুন কিছু।"
অনন্যা একটু বিরক্তই হলো কথাটা শুনে,"ছাড়ুন। বলছি, প্রত্যুষ দা  আপনার ঠিকানাটা  দিন, শ্রাদ্ধের কার্ড পাঠাবো।
ঠিকানা আমার চেয়েছো, ঠিকানার.....গান করতে করতে রাখি বলে প্রত্যুষ ফোন রেখে দিলো।

              (৩)


জুলাই মাসে ত্রিপুরা যাবে ঠিক করেছে অনন্যা। রিসার্চ এগিয়েছে ঠিকই কিন্তু জোর করে এক প্রকার।
আর পড়তে ইচ্ছে করে না। কিন্তু ছাড়া যাবেনা, বাবা, মা, বোনের দায়িত্ব।
বোন এখন বিবাহিতা। সংসার করছে। কিন্তু তবু বট গাছ হয়ে থাকতে হবে যদি.....ভেবে জোর করে লড়াইটা আনে বুকের মধ্যে।
শুধু নিজের বাড়ী না, সে ছেড়ে দিলে রণেন্দ্র,  এ-পরিবার ও যে ধসে যাবে।
বই নিয়ে এদিক ওদিক হাটতে হাটতে প্রত্যুষদার কথা মনে পড়লো অনন্যার। প্রত্যুষদা  শ্রাদ্ধে আসেন নি। অবশ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাওয়ারও ছিলো  অনন্যাদের তাই এলে প্রত্যুষদাকে একটু একাই থাকতে হতো, তাই না এসে ভালোই করেছিলেন।
তবে, অনেকদিন কোনও খবরও  নেই, ফোন করবে কিনা ভাবছে, অনেকক্ষন ভেবে ফোন করলো অনন্যা।
এতো দিন পড়ে মনে পড়লো অনন্যার? প্রত্যুষ অনধিকার রাগ দেখানোর চেষ্টা করে বললো।
অনন্যা,"কেনো, আপনার মনে পড়েছিলো?"
প্রত্যুষ: "আমি জানতাম একদিন ফোন আসবে"।
অনন্যা:"কি ভাবে?"
প্রত্যুষ: "বলবো একদিন, আগে বলো রিসার্চ কেমন হচ্ছে?"
অনন্যা: "হচ্ছে। পড়তে ইচ্ছে করছিলো না। তাই."
প্রত্যুষ: " আচ্ছা, তাই ফোন করলে। এতো কিছু করছো, নতুনদের কিছু একটা দিয়ে যাবে এর চাইতে ভালো আর কি হতে পারে?"
অনন্যা একটু বিরক্ত আর একটু একটু তাচ্ছিল্য হাসি রেখে বললো," কিছুই করলাম না, আজকে মনে হয় সবাই সব করলো। আমিই কিচ্ছু করলাম না।" আর কিছু বলতে পারলো-না অনন্যা।
প্রত্যুষ বুঝেছিলো,অনন্যা আর কিছু বলতে পারবেনা। অনন্যা যন্ত্রের মতো কাজ করে যাচ্ছে কেবল।
"কেনো পৃথিবী ছাড়ার ইচ্ছেটা চলে যাচ্ছেনাতো? আমি কি একা যাবো নাকি?", প্রত্যুষ হা,হা করে হেসে উঠলো।
অনন্যা চুপ করে থাকলো।
"আচ্ছা অনন্যা তোমার কি ভালো লাগে? মানে, যেটা করলে বা দেখলে তার চাইতে বেশি আনন্দ আর কিছু আছে বলে মনে হয়না।"
অনন্যা,ফোনটা একটু শক্ত করে ধরে," নাচ, আমার নাচ খুব ভালো লাগে,ভরতনাট্যম। বিয়ের আগে শিলিগুড়িতে ভর্তিও হয়েছিলাম, তারপর বিয়ে হয়ে গেলো।"
প্রত্যুষ বুঝলো,অনন্যার মনের অবস্থা,ইচ্ছের কথাগুলো বলার সময় শ্বাস পড়ছিলোনা ওঁর। প্রত্যুষ অনন্যাকে বললো," অনন্যা আমি একটু পরে ফোন করছি।"
অনন্যা, ঠিক আছে, বলে বলে ফোন রাখলো, যদিও ফোনটা ধরেই ছিলো, একমুহূর্তে অনন্যা চলে গেছিলো সেই নাচের দিনগুলোতে।

কি ভালোবাসতো! পড়ার ফাঁকে-ফাঁকে নাচ দেখতো ইন্টারনেট এ, সুযোগ পেলে TV-তে যখন অনন্যা HOSTEL এ ছিলো।
এরপর শিলিগুড়িতে ইনস্টিটিউট এর একটা প্রোগ্রামে একটি মেয়েকে নাচতে দেখে সেই মেয়েকে ধরে যুথিকা দির কাছে গিয়েছিলো নাচ শিখতে।
যুথিকা দি অনন্যাকে অন্য ছাত্রীদের সামনে শেখাতো না, আলাদা করে শেখাতো।
যুথিকা দির-ও ভালো লাগতো এতো সুন্দর ভাবে অনন্যা নাচ তুলতো।
উফ! কি দিন ছিলো, ভাবলো অনন্যা। আজকে অনেক বছর পর সেই আনন্দটা অনুভব করছে অনন্যা। 
একটার পর একটা দিন মনে পড়ছে, কতো পরিকল্পনা করেছিলো নাচ নিয়ে।
নাচে এতো মত্ত ছিলো যে ফোন এসেছে বুঝেও ইচ্ছে করছিলোনা ফোন ধরতে, একবার দেখলো ফোনটা, ওহ প্রত্যুষদা।
হ্যা বলুন?
SORRY, একটা কাজে আটকে গেছিলাম এতক্ষন, প্রত্যুষ দু্ঃখ নিয়ে বললো।
--ঠিক আছে। আপনিও তো ব্যস্ত থাকেন।
--তারপর, আর কি ভালো লাগে বললে নাতো?
--ওহ। রান্না করতে।মানে নতুন কিছু বানাতে দারুন লাগতো।
--ঠিক বুঝেছিলাম সেটা তোমার স্বামীকে দেখে।
--নাহ,এখন আর বানাই না। শেষ কবে বানিয়েছি মনে পড়ে না।
--শুনেই মুখে জল আসছে, কি খাওয়াবে বাদশাহী বিরিয়ানী?
--ছাড়ুন, এখন আর ইচ্ছে করেনা।
--জানো, আমার মাসীর কাছে রান্নার অনেক বই ছিলো, সে একেবারে পরীক্ষার বইয়ের মতো         পড়তো,বলে প্রত্যুষ বেশ জোরে-জোরে চিৎকার করে হেসে উঠলো।
--অনন্যাও হেসে, আমারও পরীক্ষা দেওয়ার মতো কিছু বই ছিলো। অবশ্য এখন তো আর বইয়ের দরকার হয়না এখন ইউ টিউব এ খুঁজলেই হাজার-টা চলে আসবে।
--তা ঠিক, তবে বই হাতে বানাচ্ছে কাউকে দেখা একপ্রকার চোঁখ তৃপ্তি ব্যাপার হয়- আর চোঁখ তৃপ্তি থেকে...........
অনন্যা উত্তর দিলো না,ফোন কিছুক্ষন  সেরকম ভাবেই ধরে  থাকলো। অনন্যা কথাটা কিভাবে নেবে সেটাই বোঝার চেষ্টা করছে।
অনন্যা চুপ করে আছে দেখে  কিছু সেকেন্ড অপেক্ষা করে প্রত্যুষ আবার বললো,"একটা কথা বলবো?"

পৃথিবীর সবচেয়ে কৌতূহলী কোনো কথা যদি থাকে তবে এই জিজ্ঞাসা- একটা কথা বলবো?" অনেকরকম স্রোত শরীরের মধ্যে দিয়ে চলে যায়, আর একজনকে কিছুক্ষনের জন্য স্তব্ধ করে দিতে পারে এই কথা। ঠিক সেরকম অনন্যা বুঝে উঠতে চাইছে হঠাৎ কি বলতে চায় প্রত্যুষদা?
বলুন, অনন্যা প্রত্যুষদাকে বলতে সুযোগ দিলো। 
--আজকে দারুন দিন,আমি জানি জলপাইগুড়িতে বৃষ্টি হচ্ছে। আজকে একটা নতুন DISH বানাতেই হবে। 
আচ্ছা আমি একটা কাজ সেরেই ফোন করছি। নতুন খাবার বানানোর আর্জি রেখেই ফোন রেখে দিলো প্রত্যুষ।


প্রত্যুষের বাড়াবাড়িটা অনন্যার বিরক্তর কারণ হলো। এমনিতেও মন ভালো-না। বাড়ীর অবস্থা ভালোনা,মাত্র দু-মাস হলো শশুর মশাই পৃথিবী ছেড়েছেন। লোক বলতে বাড়ীতে অনন্যার স্বামী নরেন্দ্র আর শাশুড়ী মা'।
পাশেই আত্মীয় স্বজন অনেক রয়েছে তবে আজকের দিনে সবাই ব্যস্ত, তাই বাড়ীটা আরও কেমন যেনো হয়ে যায় সন্ধ্যে থেকে। 
অনন্যা একবার ঘড়িটা দেখলো,সন্ধ্যে ছয়টা বাজে। নরেন্দ্র আজকে আর আলাদা করে বসে নি, সোজা হাসপাতাল থেকে চলে এসেছে।
অনন্যার মনে হলো দুপুর থেকে আর নিচেই নামেনি সে। দোতালার ঘরেই নিজের শোবার ঘর আর পাশের ঘরে পড়াশুনা করে, আজকে একবারও নামেনি নিচে,এদিকে যে পড়েছে তাও-না, খালি এ-ঘর আর ও-ঘর করে কেটে গেছে।
মাঝে দু-বার কাজের মেয়ে,শান্তি চা-দিয়ে গেছিলো। শান্তির মুখেই সাড়ে পাঁচটায় শুনেছে দাদা এসেছেন। আর শাশুড়ী মা'য়ের যা যা দরকার শান্তিকে নির্দেশ দিয়ে দিয়ে করিয়ে নিয়েছিলো।
প্রত্যুষের ওপরে একটু অনধিকার দাবিতে ভীষণ রাগ হলো তাই ব্যাপারটা ভালো না লাগায় নিচে নামলো অনন্যা। 


শান্তি মূলত রান্না করে চার বেলার, তাই আরও একজন আসে কাজের জন্যে, নাম প্রমীলা।
কাজেই ঘরে খুব কাজ থাকবেনা জানতো অনন্যা। শাশুড়ী মা' শুয়ে ছিলেন। সন্ধ্যে সাড়ে ছয়টা, তবু শুয়ে আছেন। করবেটাই বা কি? আর মনের অবস্থাও ভালো না। শুয়ে-শুয়ে শশুড় মশাইয়ের কথা ভাবছেন হয়তো।
চারটে ঘর নিচে, একটি শশুড় মশাই আর শাশুড়ী মা'য়ের শোবার ঘর, একটি নরেন্দ্রের স্টাডি রুম, আর একটি ঘরে শশুড় মশাই বসতেন, যে ঘরটি সম্পূর্ণ আদালত ছিলো, শশুড় মশাই বড় আইনজীবী লোক ছিলেন, আইনের পড়াশুনায় এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে বাড়ীর কোনো কিছুই উনার জানার মধ্যে ছিলো না বললেই চলে। বেশির ভাগ সময়েই লোকজন এসেই থাকতো।
অনন্যা সেই ঘরের দিকে একবার তাকালো তারপর নরেন্দ্রের ঘরের দিকে গেলো। নরেন্দ্র মেডিক্যাল স্টাডি তে মগ্ন, অনন্যার দিকে তাকানোর সময় নেই, যদিও একবার দেখে হাসলো।
অনন্যা,মাঝখানের বসার ঘরে এসে সোফায় হেলান দিয়ে বসলো।

ভালো করে দেখলো ঘরটা, আগেও চেহারা এর থেকে খুব বেশি আলাদা থাকতো না। অনন্যা একবার মেলালো বাড়ী আর শশুড় মশাই চলে যাওয়ার পরে কি এমন বদলেছে আজকের বাড়ীর মধ্যে।  শান্তি আজকে যেমন রান্না করছে তেমনই করতো, শাশুড়ী মা' আগে কেবল কখনো রান্না ঘরে কখনো নিজের ঘরে থাকতেন। নরেন্দ্র যখনই বাড়িতে আসুক রাত দশটায় খেতে বসার আগে একটা কথা বলার মতো অবস্থায় পাওয়া যেতোনা। 
আর শান্তি চা-নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করতো এ-ঘর আর ও-ঘর। 
ভেবে খুব হাসি পেলো অনন্যার। কিন্তু আজকেও একই রকম আছে বাড়ির চরিত্র।

আসলে শশুড় মশাই মারা গেছেন সেটা দুঃখের কিন্তু ওনার উপস্থিতি বা বাড়ীর আর কারও উপস্থিতি আজকের দিনের থেকে আলাদা করে দিতো না।
কাজেই সেটা বাজে লাগার কারণ না বরঙ নরেন্দ্র ভীষণ PRACTICAL। একজন ডাক্তার। জীবন মৃত্যুকে অন্য ভাবে দেখে। আর শশুর মশাইয়ের বয়স আটাত্তর হয়ে গিয়েছিলো তাই মানসিক ভাবেও নরেন্দ্র অনেটাই তৈরী ছিলো। শাশুড়ী মা' আগের থেকে একটু ভালো।
এ বাড়িতে মানসিক স্তর আগাগোড়াই অনেক আলাদা।
অনন্যা সোফায় বসে চা খেতে খেতে এসব ভেবে যাচ্ছিলো। শান্তি চা দিয়ে গিয়েছিলো।
ভাবতে ভাবতে অনন্যার মনের অবস্থার একটা পরিবর্তন অনুভব করলো।
ভেতর থেকে কেমন যেনো রান্না ঘরে যাওয়ার একটা ইচ্ছে জাগছিলো।
একবার দেখলো সাতটা বাজে।
হটাৎ সফা থেকে উঠে পড়লো অনন্যা। 
"এই শান্তি,কি বানাচ্ছিস রে?", শান্তি কি উত্তর দিলো কানেও আসেনি অনন্যার, সোজা রান্না ঘরেই চলে গেলো।


একটা রান্না করার আনন্দ চেপে বসছে অনন্যার ঘাড়ে।
"এই,শান্তি জিরে,হলুদ এর কৌটো কোথায় রেখেছিস রে?"
শান্তি একটু আড়চোখে দেখে নিয়ে হেসে বলল,-"দিদি,তুমি কি রান্না করবে নাকি?"
"কেনো আমি কি রান্না কখনোই করিনি নাকি?",অনন্যা রান্নাঘরের অবস্থাটা দেখতে দেখতেই বললো শান্তিকে।
শান্তি হলুদ, জিরে আরও কিছু কিছু দেখিয়ে দিলো।
অনন্যা বললো,"দাড়া, রান্না তুই যেমন করছিস কর আমি একটা স্পেশ্যাল ইরানী কোপ্তা বানাই।"
অনন্যা রান্না ঘরে আসায় শান্তিও খুব মজা পেয়েছে। দুজনে দারুন আনন্দ করতে করতে নিজের নিজের রান্নাও করেছে।
বয়েস অনন্যা আর শান্তির প্রায় একই হবে, যেহেতু শান্তি কাজ করে তাই সন্মান দেখিয়ে থাকে।
ইরানী কোপ্তা একবার বহূকাল আগে অনন্যা বানিয়েছিলো, তাও ইউ টিউব খুলে নিয়েছে।
রান্নার মধ্যেই একটা শিল্প আছে,যে এই মজাটা পায় তাঁর দারুন একটা সৃষ্টির আনন্দ হয়।
এই মুহূর্তে NON VEG অনন্যা এমনিতেও বানাতো না। বাড়ীর SITUATION টাও যাতে বজায় থাকে আবার রান্নার আনন্দও পাওয়া যায় সেরকমই একটা রান্না বেছে নিয়েছে অনন্যা।
"এই,শান্তি,যা তো, মা' আর দাদাকে, চা একটু দিয়ে আয়।" রান্নার OVEN বড়ো হওয়ায় অনেক কিছু একসাথে করে নেওয়া যায়, সেই সুযোগে সবার জন্যই একটু চা বানিয়ে ফেলেছে অনন্যা।
শান্তি,একত্র ট্রে- তে দু-কাপ চা নিয়ে বেরিয়ে গেলে অনন্যা বেশ জায়গা নিয়ে রান্নায় হাত দিলো।
শান্তি এই মুহূর্তে ডাল বানাচ্ছিলো, সেটাতেও হাত দিলো এক দু বার।


রান্না করতে করতে প্রত্যুষদার কথা মাথায় এলো অনন্যার। রাগটা একটু পড়েছে। 
জুলাই মাস বৃষ্টি হতেই পারে,তাই দায়িত্ব নিয়ে জলপাইগুড়িতে বৃষ্টি হচ্ছে বলেছিলেন, এমন ভাবে বলেছিলেন যেনো একেবারে দেখতে পাচ্ছেন। 
ভেবে হাসি পেলো অনন্যার।
প্রত্যুষদাকে ভাবতে ভাবতে বেশ ভালো লাগলো অনন্যার। নাচের স্টাডি গুলোও রাতে খাওয়ার পর দেখবে ঠিক করেই ফেলেছে। অনেকদিন পরে একটা জেদ পাচ্ছে মনের ভেতরে অনন্যা।
কিছুক্ষন অন্যমনস্ক হয়েছিলো মনে হয় কারণ শান্তি পাশে চলে এসেছে আর পেছনে নরেন্দ্র দাঁড়িয়ে আছে বুঝতেই পারেনি," আরে তুমি কখন এসেছো?" নরেন্দ্রাকে খুন্তি হাতেই জিজ্ঞেস করলো অনন্যা।
নরেন্দ্র: চা খেয়েই বুঝেছিলাম। এ চা শান্তি বানায়নি। তাই দেখতে আসলাম। কি বানাচ্ছ?
দাদা র কোথায় শান্তি মুখ টিপে হাসছিলো। সেদিকে দেখে অনন্যা বললো,"যেনো শোনেনি কি বানাচ্ছি?"
"দাঁড়াও-দাঁড়াও আঁচ টাকে একটু কম করে পাকাও তাহলে জমবে",নরেন্দ্র শুধু বললোই-না,আঁচটা কে একটু কমিয়েও  দিলো।
এতক্ষনে ব্যাপারটা আরও জমে গেলো, নরেন্দ্রও যোগ দিলো রান্নাঘরে। 
বেশ উত্তেজনায় নিলো রান্নাপর্ব।
একটু চিৎকারে শাশুড়ী মা'ও এসে দেখে গেলো দু বার।

                             (৪)


গতোকাল রাত এর কথা ভোলা যাবে না অনেকদিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে যেনো একই বাড়ী অন্যরকম মনে হচ্ছিলো অনন্যার কাছে। 
নরেন্দ্র সকাল আটটায় বেরিয়ে গেছে হাসপাতালে।
শাশুড়ী মা'কেও দেখভাল করে নিয়েছে যা যা দরকার সকালে, এখন সে পূজার ঘরে।
শান্তি আর প্রমীলা কে INSTRUCTION দিয়ে যাচ্ছে।
অথচ কোথাও অসুবিধে কিছু মনে হচ্ছেনা অনন্যার। একটা ফুড়ফুড়ে ভাব আছে মনের মধ্যে।
গতোকাল রাতে খেতে বসে অনেক গল্প হয়েছে নরেন্দ্র র সাথে।
তারপর প্রায় একটা-দেড়টা পর্যন্ত নাচ যা একসময়ে  শিখেছিলো সেগুলো নাড়াচাড়া করেছে। ইউ টিউব এ অনেক নাচের মুদ্রা লক্ষ করেছে।
একটা ভালো রাত ছিলো। 
এখন রিসার্চের কাজে বেশ মন আসছে। আজকে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যাবে অনন্যা, সেরকম বদ্ধপরিকর হয়েই বসলো পড়তে।
নরেন্দ্র নেই, বাকি পড়ার সাথে সাথে সামলে নেবে ভালো করেই অনন্যা জানে।


সময়কে বোঝা খুব মুশকিল। যখন ভালো লাগেনা তখন এক একটা মিনিট এক একটা ঘন্টার মতো মনে হয়। আর যখন ভালো লাগে তখন কিছুতেই সময়কে ধরে রাখা যায়না।
অনন্যারও তাই হয়েছে। কখন যে সময় পেরিয়ে বিকেল হয়ে গেলো বোঝাই যায়নি।
আগের থেকে অনেক বেশি কাজ করছে অনন্যা, মাঝখানে রিসার্চ টা বেশি করছিলোনা, এখন অনেক পড়া শুরু করেছে, সব দিকেই বেশি করে খেয়াল রাখছে, বলতে গেলে খেয়াল রাখতে পারছে কারণ মন ভালো থাকছে আজকাল।

ঘড়ির দিকে তাকালো অনন্যা, সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। আজকে নরেন্দ্র বাড়ী আসবেতো? অনন্যা এখন নিচেই আছে।
আজকেও অনন্যা এক দুটো রান্না করবে শান্তিকে বলে রেখেছে। শান্তি বিকেল চারটেতে চলে আসে আর রাতের রান্না শেষ করে যায়।
বিকেলে কিছু বানায় আর যেহেতু নরেন্দ্র রা ফ্রেশ খেতে পছন্দ করে তাই রাতে নতুন করে সব রান্না হয়।
অনন্যা ফোন টা নিলো নরেন্দ্রকে করবে বলে।

                      (৫)


সময়কে বোঝা সত্যি যায়না।
একটা ঝড়ের মুহূর্ত এসেছিলো কয়েকদিন আগে যখন আবার নাচ উঠেছিলো শরীরে।
মাত্র কিছুদিনে আসতে আসতে কেমন ভাবে যেনো নাচ নেমে গেলো শরীর ছেড়ে।
এতো আনন্দ কথা থেকে এসেছিলো? কেনো এসেছিলো? এতো আনন্দকে অনন্যার ভয় লাগে।
যেদিন আবার রান্না শুরু করেছিল আর নাচ তুলেছিলো তারপর মাত্র কয়েকটা দিন কেটেছে কিন্তু এই কয়েকটা দিন অনন্যার কাছে কয়েকটা বছর মনে হচ্ছে।
যেনো অনেক দিন আগে মুহূর্তটা এসেছিলো।

তার পরিবর্তে একটা অস্থিরতা  ঘিড়ে ধরছে অনন্যাকে।
মে মাসে এসেছিলো যখন শশুর মশাই অসুস্থ হয়েছিলো আর আজকে জুলাই মাস শেষ হতে চললো, এদিকে এলোমেলো হয়ে পড়েছে সব।
নরেন্দ্র কখনোই বাড়ীর কিছু দেখেনি। শশুর-মশাইও দেখতেন না। সব দায়িত্ব অনন্যার ওপরে।
শশুর-বাড়ি, শশুড়বাড়ির আতত্মীয়স্বজন সামলাতে নাজেহাল তার ওপর অনন্যার কাছে সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব নিজের বাবা, মা।
বাবা র শরীর ভালো না। বাবা কোনো কথা শুনতে চায় না। রাগ উঠে যায় অনন্যার।
বোনকে নিয়ে এই মুহূর্তে সেরকম চিন্তা না থাকলেও ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত রাখাটা দরকার।
এতগুলো চিন্তা নিয়ে আর পারছেনা টানতে।
যে প্রদীপ জ্বলেছিল, আসতে আসতে নিভে যাচ্ছে যেনো। 
তারমধ্যে ত্রিপুরা চলে যেতেই হবে। স্যার কে বলে রেখেছিলো। স্যার যেমন বলেছিলেন তেমন কনসার্ন মেইল ও করে রেখেছে।

কয়েক দিন থেকে বইপত্রের দিকে তাঁকালে কেমন একটা ভয় ভয় লাগছে। 
শান্তি,চা রেখে গেলো টেবিল এ। অনন্যা তাকালো না দেখে বলে গেলো,"দিদি, চা।"
অনন্যা এবার তাকালো। কয়েক দিন কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না অনন্যার। 
আজকে রবিবার, জানে নরেন্দ্র বাড়িতেই আছে তাও নিচে নামতে ইচ্ছে করছেনা।
একটা এনার্জি এসেছিলো কিন্তু হঠাৎ করে চলে যাচ্ছে। বরঙ কোথা থেকে যেনো একটা ভয় পেয়ে বসছে অনন্যার ওপর। ঠিক বুঝতে পারছেনা।
নরেন্দ্র পড়ছে নিশ্চই।
রিসার্চটা নিয়েও একটা ভয় হচ্ছে। একদম গতি পাচ্ছেনা। স্যার বোধ হয় খুব রেগে আছে। আগে এতো এতো কাজ দিতেন স্যার, হঠাৎ কেমন যেনো সরে যাচ্ছে সব কিছু।
কি করবে মাথায় আসছেনা অনন্যার। শোবার ঘরেই আছে, পড়ার ঘরে যেতেই ইচ্ছে করে না।

সকাল বেলা। রবিবার। প্রত্যুষদাকে খুব মনে পড়ছে কেনো? অনন্যা বুঝতে পারছেনা।
সেই শেষ কথা হয়েছিলো অনন্যা মনে করলো যেদিন একটা DISH বানাতেই হবে বলেছিলন।
অনন্যা সেদিন রেগে গেছিলো। আজকে খুব মনে পড়ছে।
ফোন করবে একবার? কিন্তু প্রত্যুষদাও তো এর মধ্যে আর ফোন করেননি। 
ভালো দেখাবে ফোন করা? ফেসবুক এ পরিচয় মাত্র, কতটাই চেনে?
এতো ভাবতে আর ভালো লাগছিলো না অনন্যার তাই খাটে বসে প্রত্যুষদাকে ফোন করেই বসলো।


এতো দিন পরে মনে পড়লো তোমার? প্রত্যুষ ফোন ধরে একটু রাগ দেখালো মনে হয়।
অনন্যা: আমাকেও তো মনে পড়েনি আপনার।
প্রত্যুষ: যারা পৃথিবী ছাড়তে চায় তাঁদের কাছে আর কি পাওয়ার আছে? তবে জানতাম ফোন করবে।
অনন্যা: কি ভাবে?
অনন্যার অবাক হওয়া প্রশ্নের উত্তর প্রত্যুষ দিলো না,"কেমন আছো বলো? আর ত্রিপুরারর খবর কি?"
অনন্যা একটু সময় নিয়ে বললো,"আমি NIT তে যায়নি তো এখনো।"
--কেনো?
এতো কাজ পড়ে আছে। আর জানিনা কেনো যাচ্ছিনা? অনন্যা একটু রাগ নিয়েই বললো প্রত্যুষকে।

প্রত্যুষ এবারে একটু ভালো করে ধরলো ফোনটা।
--অনন্যা, তোমার প্রবলেম কি জানো?
PROBLEM? অনন্যা কোনো উত্তর দিলোনা।
প্রত্যুষ, একটু হেসে," রাগ হয় যদি অন্য কেউ নিজের সম্পর্কে PROBLEM শব্দটা নেয়। কেনো জানো 
কারণ আমরা নিজেরা জানিনা আমাদের PROBLEM কি, তাই আমরা রাগ করি।"

"অনন্যা, তুমি কতগুলো CHARACTER- কে তোমার জীবনের DESTINY মনে করো। তুমি মনে করো তুমি এসেছো পৃথিবীতে কতগুলো মানুষকে খুশি করতে। তাই তোমার লক্ষ কতগুলো মানুষ।
কখনও ভেবেছো তুমি ভালো নাচ করো কেনো? 
ভেবেছো রান্না করে তোমার মধ্যে কে-কি পায়, যে এতো খুশি হয়ে ওঠো?
কখনও ভেবেছো রিসার্চ এ সুযোগ কেন পেয়েছো?
ভাবোনি।
কারণ তোমার কাছে কতগুলো মানুষ হচ্ছে পৃথিবী।
নাচের ঝড় তুলে পৃথিবীকে শান্ত করা বা শান্তি দেওয়াটা  একজনের কি লক্ষ হতে পারেনা?
রিসার্চ করে নতুন কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটা লক্ষ হতে পারে না?"
     
প্রত্যুষ একটু চুপ হলো।

অনন্যা একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে,"আর বাবা, মা,স্বামী, পরিবার,লোক-কিছুনা?"
--অনন্যা, এরা কেউ তোমাকে স্বেচ্ছায় নেয়নি।
--অনন্যা একটু হাসলো," বলছো বাবা, মা'ও না?"
--তুমি অবাক হবে যে তোমার জন্মের ২মিনিট আগেও তাঁরা জানতেনও না যে তুমি আসছো।
তাঁরা বলেছেন,"যেই আসুক আমরা খুশি"। আসলে যেই আসুক অর্ধেক জীবন আমরা দেখবো আর অর্ধেক "ও" দেখবে। 
কি জানো এই সত্যি টা মানতে আমরা চাইনা, ঠিক যেমন একদিন মৃত্যু হবে মানতে চাইনা।
--আর স্বামী? সেতো স্বেচ্ছায় এগিয়েছে।
--অনন্যা, এতো পরকীয়া তাহলে হতোনা। এক-ঘন্টায় মানুষ চেনা যায়না। দুজন দেখে দুজনের দায়িত্ব নিতে পারবে কিনা?
অনন্যা একটু চুপ করে," যাঁরা ভালোবেসে বিয়ে করে?"
প্রত্যুষ একটু বিরক্ত হয়ে বললো,"আমরা নিজে-কে জানিনা আর আর একজনকে ভালোবাসা?"

"অনন্যা তুমি দায়িত্ব, ভালোবাসা, লক্ষ, সব কিছুর মধ্যে এলোমেলো করে ফেলেছো।
তুমি যেটাকে একমাত্র লক্ষ বলছো, সে টা অনেক দায়িত্বর মধ্যে এক একটা দায়িত্ব।"

"তোমার স্বামী,নরেন্দ্র তোমাকে যা দেবেন  ভেবেছিলেন তা তিনি দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন।
তুমি তাঁর ওপর রাগ করতে পারোনা কারণ কতগুলো অধিকার তোমার জন্য উনি নেবেন সেই চুক্তি বিয়ে করার সময় না বলেও তোমাদের মধ্যে হয়েছিলো, ভেবে দেখো যতটুকু আশা করা যায়, উনি কি সেটা দেননি?"

"আর লক্ষ্য হলো তুমি তোমার মধ্যে যা আছে তা দিয়ে তোমার পরিবার, তোমার লোক আর সব মানুষকে ভালো করে দিয়ে যেতে পারো বা আনন্দ দিয়ে যেতে পারো....... সেটা হচ্ছে তোমার লক্ষ্য।"

"তুমি না থাকলেও তোমার দায়িত্ব গুলো আটকে যাবে না, কেউ না কেউ নেবে। 
কিন্তু তোমার DESTINY হারিয়ে যাবে সেটা কেউ নেবে না। তোমার লক্ষ হারিয়ে যাবে।"

"অনন্যা,মন আর মাথা কি বলছে শুনলে আমরা হেরে যাবো। আমরা কি বলছি সেই মতো মন আর মাথাকে চলতে দাও।"


অনন্যা: " আপনি ত্রিপুরা যেতে বলছেন?"
প্রত্যুষ: "কখনও ভেবেছো এতো মাস তোমার স্যার কিভাবে তোমাকে ছেড়ে দিয়ে আছেন?
বুঝিয়ে বলো উনি তোমাকে সাহায্য করতে চান।"
অনন্যা কিছু বলতে যাচ্ছিলো। অনন্যাকে বলতে না দিয়ে প্রত্যুষ বললো, রাখি অনন্যা,একটা কাজ সেরে ফোন করছি।
প্রত্যুষ রেখে দিলো ফোন।

                  ( ৬)


প্রত্যুষদা, সত্যি এলোমেলো করে দিয়েছিলো অনন্যার জীবন।
অনন্যা প্রত্যুষদার কথা-গুলোকে পাত্তা দিতে চাইছিলোনা, কিন্তু কথাগুলো কেনো যে মাথা থেকে বের হচ্ছেনা।
আজেবাজে কথা বলেছেন যতোসব।
মা, বাবা, স্বামী সম্পর্কে, কি বললেন,"এসব দায়িত্ব।" 

যদি তাই হবে তাহলে...... না, ভুল হচ্ছে ওনার কোথাও। অবশ্য প্রত্যুষ DESTINY কে পেতে লক্ষ পূরণের মধ্যে দিয়ে সব দায়িত্ব নিতে বলেছেন।
আমার DESTINY কি?  লক্ষ কি?
প্রত্যুষের ওপর যতই রাগ করুক অনন্যা, একটা কথা ঠিক বলেছিলেন, NIT স্যার এর প্রসঙ্গে। বলেছিলেন,"স্যার সাহায্য করতে চায়", অনন্যা যেদিন কেঁদে স্যারকে যাওয়ার অসুবিধে বলেছিলো, স্যার খুশি হয়েছিলেন। স্যার বলেছিলেন,"আমাকে খুলে বলে ভালো করেছো।আমি জানি বিবাহিতা একজনের পক্ষে কতো অসুবিধে। তুমি যদি আমার দেওয়া কাজ ঠিক মতো করো তবে আমি নিজ দায়িত্বে তোমাকে বাড়ি থেকে রিসার্চ করার ছাড় দিতে পাড়ি, আর জলপাইগুড়িতে কোথায় INSTRUMENT এর HELP পাবে আমি সে ব্যবস্থা করে দেবো।"

এটা যে কত বোরো একটা ব্যাপার ছিলো অনন্যার কাছে,- সেটা সেই জানে একমাত্র।
হ্যা প্রত্যুষদা বলেছিলেন বলেই  অনন্যা সেদিন স্যারকে মুখ ফুটে বলেছিলো, না হলে....,,
আর ওই কথাটাও অনেক কাজে দিয়েছে "মন আর মাথা যেটা বলবে সেটা না, যেটা আমি মন আর মাথা কে বলবো ওরা সেটা করবে", এই কথাটা আমূল বদলে দিয়েছে অনন্যাকে।
এখন মন আর মাথা যখন সায় দেয়না, ইচ্ছে করেনা কোনো কিছু যখন তখন অনন্যা জোর করে মন আর মাথা কে দিয়ে কাজ করায় যেমন যখন পড়তে ইচ্ছে করেনা তখন জোর করে পড়তে বসে অনন্যা। আর দেখেছে বেশিরভাগ ভালো কাজ করতেই ইচ্ছে করেনা, তাই সব জোর করেই অনন্যা করে থাকে। আর এর ফলে দারুন উপকারও পেয়েছে অনন্যা।

আরও একটা কথা অনন্যাকে ভীষণ হেল্প করেছে সেটা হলো অনন্যার নাচ।
আজকে অনন্যা অনেক বেশি যুক্ত নাচের পৃথিবীতে। নিজে শিখছে আবার শেখাচ্ছেও।  জলপাইগুড়ি শুধু না শিলিগুড়ি এমনকি নাচের জন্যে কলকাতাতেও যেতে হয় অনন্যাকে।

কাজেই প্রত্যুষের ওপরে রাগ থাকলেও ২০১৮ সালের সেই জুলাই মাসে যদি কথা মতন স্যারকে ফোন না করতো তাহলে এসব আর হয়ে উঠতোনা।
অনেক কিছু হয়ে উঠতোনা।
আজকে দু বছরে অনেক কিছু করেছে সে। রিসার্চ ভালোমতো শেষ হয়েছে। 
USA র একটি বিশেষ ORGANISATION এর সাথে যুক্ত। 
তাঁর ভালো লাগার নাচ আজকে একটা জায়গা পেয়েছে।


আর এ সব কিছু হয়েছে কারণ অনন্যা মন থেকে ভীষণ খুশি থাকতে পেরেছে।আনন্দ দিয়েছে মনকে।
সেই আনন্দ দায়িত্বগুলো নেভাতে কি যে শক্তি দিয়ে গেছে, যে শক্তিতে লোকজন, পরিবার, নিজের DESTINY, নিজের লক্ষ, একটা সম্পূর্ণতা পেয়েছে।
আরও আরও কাজ বাকি অনন্যার।
এগোতে হবে, থামলে হবেনা।

                            (৭)


নাও এই বইটা পড়ো, কাজে-কর্মে খুব  HELP পাবে। নরেন্দ্র জন্মদিন উপলক্ষে অনন্যার হাতে একটি বই দিলো। 
রবিবার সকাল। খুব ভালো দিনে তোমার জন্মদিন, হাসলো নরেন্দ্র।
 বইটা খুলে অনন্যা," প্রত্যুষ সরকার।"
নরেন্দ্র চা হাতে বসে অনন্যার দিকে তাকালো," এমন ভাবে বলছো, তুমি চেনো ওনাকে।"
না- বলে, অনন্যা বই হাতে বসলো। হাতে চা নিয়ে পৃষ্ঠা খুললো।
একটি-দুটি.........পরে পড়বে করে করেও বেশ কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়ে ফেললো অনন্যা।
মাঝখানের দু-তিনটে আর শেষের পাতা পড়ে, একদম শেষে লেখক পরিচয়ে চোঁখ রাখলো।
লেখক, প্রত্যুষ সরকার, জন্ম শিলিগুড়ি, ইন্ডিয়া তে।
উনি লেখেন চরিত্রের সন্ধানে।
উনি  এক চরিত্র সন্ধানী।

অনন্যা লেখক পরিচয়ে লেখকের PHONE NUMBER পেয়ে গেলো।
প্রত্যুষদার ফোন আর কোনোদিন আসেনি অনন্যার কাছে। 
PHONE NUMBER বদলে গেছে দেখলো অনন্যা, বা হতে পারে এই NUMBER টাই আসল। আর চরিত্র সন্ধানে নতুন NUMBER নিয়ে রাখা হয়।
এ বইতে গল্পের প্রধান চরিত্র যে অনন্যা নিজে তা এই কয়েকটি পৃষ্ঠাই যথেষ্ট ছিলো বোঝাতে।

অনন্যা বইটা অল্প কোলের ওপরে রেখে মনে-মনে বললো, "আমি যে আজকেও পৃথিবী ছাড়তে চাই প্রত্যুষদা।"

অনন্যা সোফা থেকে উঠলো।
উঠে যাচ্ছ, নরেন্দ্র জিজ্ঞেস করলো অনন্যাকে।
অনন্যা উত্তর না দিয়ে উঠে গেলো, মনে মনে শুধু বললো,"প্রত্যুষ সরকার,আমি ফোন করবো না। যতই তুমি জানো আমি ফোন করবো।
এবার আমি ফোন করবোনা।"

"এবার তুমি ফোন করবে। আমি জানি।"























Post a Comment

0 Comments