অনুভূতি । Bengali real life story

                  
কলমে : দিব্যেন্দু সরকার


                                               ( ১)     


অনেক পাপ করলাম।   আমি জানি।  যদিও বাস্তবে পাপ করবার মতো লোক আমি নই। 
তবু করছি।
আমি পরজন্মে বিশ্বাসী। 
পরজন্মে যে মানুষ হবো না , মোটামোটি নিশ্চিত।
আমাদের বাড়ির সামনে অনেক গরু এসে জমায়েত করে, এক দৃষ্টি মায়া -মায়া চোখে চেয়ে থাকে বাড়ির দিকে।  আজকাল একটু ভয় হচ্ছে , আমিও যদি গরু হয়ে জন্ম নি পরজন্মে ?  আমিও  যদি এ ভাবে চেয়ে থাকি কোনো বাড়ির দিকে একটু ভালোবাসা অথবা একটু উষ্ণতার জন্যে।
কিম্বা রোজ রাতে যে বেড়াল -টা  বাড়িতে ঢোকে একটু আস্তানা খুঁজতে , আমিও যদি সেই বেড়াল হয়ে আসি ?  
আমাকেও তাড়িয়ে দেবে , দৌড়ে দরজার বাইরে গিয়ে তাকাবো। 
বলতে পারবো-না , আমি মানুষ।
যদি আর -ও  নিচে , ইঁদুর বা টিকটিকি হই। 
ভগবান খুব পাপ করছি , ভয় হচ্ছে নিজের ওপরে।
আমাকে পরজন্মে কোকিল বা মেঘ করে দিও অন্তত ,  বৃষ্টি হয়ে ধুয়ে যেতে পারবো। 

অনিকেত লিখছে টেবিলে , কিন্তু কিছুতেই লেখা আসছে না , আজে- বাজে  চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়।
টেবিল এর পাশে খাটে শুয়ে আছে অনন্যা । 
আজকে অনিকেত এর নিজের ওপরে অন্যায় বোধ হচ্ছে।
চার বছর হয়েছে অনন্যা র সঙ্গে বিয়ে হয়েছে অনিকেত এর , কিন্তু ভালোবাসা কি এসেছে অনিকেত এর মনে ?-  অনিকেত অনন্যা কে ভালোবাসে , কিন্তু সেটা দায়িত্ব, কর্তব্য অথবা একটা প্রয়োজন। 
যে ভালোবাসার কথা অনিকেত ভাবছে সেটা কিছুতেই জন্ম নিতে পারছে না। 
অনন্যা ভীষণ অপরিণত , বাচ্ছাদের মতন।  ওঁর  মুখে কেমন যেনো একটা  সারল্যতা আছে। যেনো একটি বাচ্চা মেয়ে। 

এই পাঁচ   বছরে একটু- একটু করে অনিকেত অনন্যার   দিদি কে ভালোবেসে ফেলেছে। 
দিদি " ইন্দ্রানী" রায় বিবাহিতা। বয়েসে অনিকেত এর চাইতে দু- বছরের ছোটো। 
পড়াশুনা , চিন্তা- ভাবনার তীক্ষ্ণতা অসামান্য একটা ব্যক্তিত্ব এনে দিয়েছে ইন্দ্রানী কে। অনিকেত জানে, যে গভীরতা ইন্দ্রানী র মধ্যে আছে  অনিকেত সেই গভীরতা তাই ডুব দিতে চায়। কিন্তু সেই  চাওয়া অনুযায়ী কি বিয়ে করেছিলো অনিকেত ?-- না। - যদিও অনিকেত যবে অনন্যা কে বিয়ে করে সেন উপাধি থেকে গর্বের সঙ্গে সরকার উপাধিতে পরিবর্তন করে তার তিন বছর আগেই ইন্দ্রানী র বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো তাঁর ই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এর একজন সহ - প্রফেসর - বিনায়ক রায় এর সঙ্গে।
শিক্ষাগত কারণে দুজনের যে বেশ নাম ছিলো নিজের নিজের জায়গায় তার প্রমান পেয়েছে অনিকেত ।
এই পাঁচ বছরে সে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে ইন্দ্রাণীকে।  এটা ঠিক যবে অনিকেত অনন্যা কে বিয়ে করে তার তিন বছর আগেই ইন্দ্রানী র বিয়ে হয়ে গেছিলো , কিন্তু অনিকেত তো ইন্দ্রানী -কে ভালোবাসে না।  ইন্দ্রানী র মধ্যে যে গভীরতার প্রসারণ আছে তাকে ভালোবাসে অনিকেত। 

রাত সাড়ে বারোটা বাজে, টেবিল এ খাতা- পেন , অনিকেত চেয়ার এ হেলান দিয়ে - কোথায় যেনো কি একটা না পাওয়া নিয়ে ভেবে যাচ্ছে।  অনিকেত জানে ও যা করছে তা ঠিক নয়, কিন্তু কেনো , কোথায় নিজেকে সরিয়ে নিতে পারছে না অনিকেত জানে না।  বার-বার কেনো নেশার মতো ইন্দ্রানী কে সে পায় , জানে না।   
অনিকেত যে ভালোবাসে , অনেক ভাবে ইন্দ্রানী-কে প্রকাশ করেছে।  সেটা প্রকাশ করতে গিয়ে একটা লজ্জা , অন্যায় বোধ ভেতরে- ভেতরে -চেপে ধরছে অনিকেত কে।  যদিও , ইন্দ্রানী সুন্দর ভাবে রক্ষা করে যাচ্ছে বোনের সংসার , যেনো , কিছুই সে উপলব্ধি করে নি। 
এই একটা ব্যাপার অনিকেত কে নিশ্চিন্তি দেয় , আর অনন্যা অনিকেত এর মধ্যের এই মন-কে জানে না। 
এতো টা গভীরে ঢোকা যে অনন্যা র পক্ষে সম্ভব না , অনিকেত জানে। 
লেখা বন্ধ করে অনন্যা পাশে শুয়ে পড়লো অনিকেত।

সকাল নয় -টা বাজে , ওঠো , অনিকেত কে ঝাঁকিয়ে হাসতে -হাসতে ডাকলো অনন্যা। 
অনিকেত, ইশ রবিবার এর সকাল এতো তাড়াতাড়ি কেন  যেতে থাকে ?  রিপান কি করছে ?
অনন্যা মশারী তুলতে -তুলতে - বললো , ছবি আঁকছে বসার ঘরে বসে। 
অনিকেত হাসলো , রিপান ওদের ছেলে , দেখতে -দেখতে তিন বছর হয়ে গেলো , একটা শ্বাস টেনে অনিকেত অনন্যা র দিকে তাকিয়ে বললো।
অনন্যা , হ্যা , চার-টে স্কুল এর  এডমিশন -ফর্ম  সাবমিট করা হয়ে গেছে , সামনের  মাসে র  দশ থেকে পনেরো তারিখ এর মধ্যে সব কিছু হয়ে যাবে স্কুল -গুলি -থেকে বলেছে। 

--- সেশন কবে থেকে ?

--- সেশন , বলছে এপ্রিল মাস থেকে। তুমি চিন্তা করো না , তোমার যা কাজের চাপ।  নাও ওঠো , আমার অনেক কাজ আছে , অনিকেত কে জোর দিতে -দিতে তাগাদা দিলো অনন্যা। 

অনিকেত বিছানা ছেড়ে উঠলো,  " তোমার তো অনেক কাজ " , অনন্যা র বলা কথা টা বার দুয়েক নিজের মধ্যেই বললো অনিকেত,  আর ভাবলো , সত্যি কি এতো ব্যস্ত অনিকেত ? এটা ফেব্রুয়ারী , অনিকেত কি সত্যি দেখেনি ?- রিপান কোন স্কুল এ ভর্তি হবে তা নিয়ে অনন্যা কে দৌড়ো-দৌড়ি করতে।
এটা ঠিক বাড়ির সব দিকে অনন্যা র প্রখর নজর, অনিকেত এর মা , " রাজর্ষী সরকার " বাড়ি-টাকে ভীষণ ভালোবাসে।
ভোর থেকে বাড়ির র প্রত্যেক টি ইঞ্চিতে খুঁটে খুঁটে কাজ চলে। 
মা' য়ের  সঙ্গে অনন্যাও  এখন বাড়ির প্রত্যেক ইঞ্চির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
অনন্যার একটা গুন , ও , মুখের ওপরে প্রতিবাদ করে না , সব -টা  মেনে নেয়। 
অনিকেত বসার ঘরের  দিকে  গেলো। বেসিন বসার ঘরের পাশেই। অনিকেত কে দেখেই রিপান চিৎকার করে উঠলো। কি আঁকছো ? অনিকেত রিপান  এর  পাশে বসলো। 
মজার ছলে পৃষ্ঠা উল্টে রিপান এর দাগ কাটা দেখে হাসছে। এর মধ্যে একটা আঁকা দেখে স্থির হলো , দারুন তো !! কে আঁকিয়েছে ?
ওর আঁকার খাতায় কে অন্য কে আঁকবে ?- আমি ই এঁকেছিলাম।- অনন্যা হাসতে -হাসতে ওদের শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। 
অবাক চোখে অনিকেত অনন্যার দিকে তাকিয়ে আছে,  এক-এক- করে তিন , চারটে , আরও ছবি দেখলো পাতা উল্টে।
অনিকেত : এরকম আঁকতে পারো ! এটা তো যারা অনেক বছর শিখেছে তাদের মধ্যেও অনেকেই এতটা নিখুঁত পারবেনা। তুমি কি শিখেছিলে কোথাও ?

অনন্যা : নাহ তো ' শিখিনি। এমনি । 
রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো অনন্যা। 

অনিকেত এর বোঝা উচিত ছিলো , শ্বশুর মশায়ের স্কুল কেরানির চাকরির ওপরে বিশাল পরিবার এর চাপ। তাই দিদি র জন্যে অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছিলো অনন্য কে। 
দিদি ইন্দ্রানী র পড়াশুনা টাই ছিলো একমাত্র জীবন , আর সেটাই ছিলো অনন্যা এবং ওদের বাবা র একমাত্র উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য সফল করতে গিয়ে অনন্যা , বাবা র সাথে সবজি পর্যন্ত বিক্রি করেছে কিছু দিন। 
সেই ইতিহাস শ্বশুর বাড়ির পাড়া র একজন বেশ ঘটা করে শুনিয়েছিল অনিকেত কে বিয়ের পরে পরেই।
চা- খেয়েছিস ? ঘরে ছাদ থেকে কাজ সেরে  বসার ঘরে ঢুকলো মা ' রাজর্ষি। 
না, মুখ ধুইনি , অনন্যা চা বানাচ্ছে।
মা, বাজার করতে হবে ?-  জিজ্ঞেস করলো অনিকেত। 
--সকালে তো অনন্যা নিয়ে আসলো সব.
অনিকেত তাকালো মা'য়ের দিকে।

                                              (২)

হ্যালো -হ্যালো- , বেশ কয়েক বার অন্যমনস্ক ভাবে কাউকে পাওয়ার চেষ্টা করছে অনিকেত। তিন -তালা র  ছাদে কিছু গাছ রয়েছে টবে।  অনিকেত এর বাবা দো-তালা  র ওপরের ছাদে ভালো বাগান করেছে ,
পাড়া র অনেকেই বাগান বাড়ি বলে থাকে।
ওপরের ছাদে দাঁড়াতে ভীষণ ভালো লাগে অনিকেত এর।  সামনে পাহাড়।  শিলিগুড়ি থেকে শীত কালে র সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও পরিষ্কার দেখা যায়। 
হ্যা , বলো , কি করছো ? কালকে একদম তোমার ফোন ধরতে পারিনি , খারাপ পেয়ো-না প্লিজ - 

অনিকেত এর ফোন ধরে আক্ষেপ করলো ইন্দ্রানী।

অনিকেত : আরে , ঠিক আছে।  তুমি এতো ব্যস্ত। 

ইন্দ্রানী : ধুর ব্যস্ত , আর ভালো লাগে-না , দেখো - আজকে রবি বার , এখন বারোটা বাজে , আর আমি থ্রিসিস লিখছি ক্যাম্পাস এ এসে। 
সবাই কি সুন্দর বাড়িতে আনন্দ করছে। আর আমি ?

অনিকেত : সবাই তো একরকম ভাবে বাঁচে না।  তুমি যেটা করছো সেটাও বেঁচে থাকার একটা উদ্দেশ্য।

ইন্দ্রানী : আমরা সব উদ্দেশ্য কি সত্যি স্বেচ্ছায় নি অনিকেত ?  আমরা যা করি  - কেনো করছি , সত্যি স্পষ্ট করতে পারি অন্যকে বা নিজেকেও ?

অনিকেত : সবার জীবন এক হয় না।  তুমি সেটা করছো যেটা তোমার জন্য ভালো। 

ইন্দ্রানী : তাই।   অনিকেত , আমাদের জীবন অনেকটা পাহাড়ি খরস্রোতা নদীর মতো। ওপরে শান্ত কিন্তু পা দাও,- টেনে নিয়ে যাবে।  হঠাৎ বুঝবে কতো চোরাবালি বুকে নিয়ে চলছে নদী। 
একটু হাসলো ইন্দ্রানী।
অনিকেত ইন্দ্রানী র এই তীক্ষ্ণ হাসি জানে , যখন এই হাসি মুখে নেয় ইন্দ্রানী তখন অনেক প্রশ্ন ঠিকরে পড়তে থাকে। 
অনিকেত একটু সময় নিয়ে , সবাই শুরু থেকে শেষ করে , তুমি না হয় শেষ থেকে শুরু করো। 
অনিকেত এর কথায় ইন্দ্রানী তীক্ষ হাসিতে আরও ধার আনলো , তা ঠিক -ই  বলেছো।  আর আমাদের রিপান কি করছে ? তুমি রাত এ যে হোয়াটস্যাপ গুলো করেছো , আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি ! এতো , কে শেখাচ্ছে ? - তুমি নিশ্চই।
ঠিক আছে, আমাকে স্যার একটু ডাকছেন , পরে ফোন করছি , প্লিজ। 
অনিকেত কিছু বলতে যাচ্ছিলো , কিন্তু ইন্দ্রানী সময় দিতে পারলো না।  ফোন- টা হাতে নিয়ে কিছুক্ষন সেখানেই দাঁড়ালো অনিকেত। 
অনিকেত হয়তো ইন্দ্রানী-কে বলতো না , রিপান -কে যা শেখানোর তা অনন্যা ই শেখাচ্ছে।  আর অনন্যা ই ফটো-গুলো তুলে অনিকেত কে পাঠিয়েছিলো কয়েকদিনে যখন অনিকেত কাজে থাকে। সেই ফটো ই ইন্দ্রানী কে পাঠিয়েছে । 
অনিকেত ভাবছে ছাদের রেলিং ধরে।   ঠিক ভুল জানে না , কিন্তু অনিকেত বুঝতে পারছে অনিকেত এর কোষ যে খাদ্য চায় তা ইন্দ্রানী র মতো কোনো নারী র কাছেই সে পেতে পারে। 
রোজ রাতে হোয়াটস্যাপ এ অনেক গল্প হয় ইন্দ্রানী র সঙ্গে। গতকাল এর মতো দু-এক দিন ছাড়া , অনেক রকম বিষয় নিয়ে ই কথা হয়।  
পৃথিবী -র সৃষ্টি র ওপরেই কতো আলোচনা হয়। 
ভালো লাগে ইন্দ্রানী র সঙ্গে অনিকেত এর জগৎ।  এটা কি অপরাধ ? এটা পছন্দ করা না , এটা তৈরী হওয়া , নিজের ইচ্ছে তে যে জল তৈরী হয় আর নিজের ইচ্ছেতে চলে তাকে তো মোহনা র দিকে পৌঁছতেই হবে। 
আর সম্পর্ক -গুলো কে কি নিয়মের ছকে ফেলা যায় ? প্রশ্ন-গুলো নিজের কাছেই রাখছিলো অনিকেত।
হঠাৎ অনিকেত এর মনে হলো জয়দীপ কে কাল ফোন করে আসতে বলেছিলো।  জয়দীপ সাত বছর পর বাঙ্গালোর  থেকে এসেছে। অনিকেত এর বিয়ে-তেও আসতে পারেনি।

ভাই , কোথায়  ছিলে ? এতক্ষনে অনন্যা আমাদের অনেক- অনেক কথা জেনে নিয়েছে।  বলে হেসে উঠলো জয়দীপ।
অনিকেত ও হাসলো , কখন এলি ? আমাকে খবর দিলে না কেন ? অনন্যা কে একটু জোর এ প্রশ্ন করলো অনিকেত। 
অনন্যা চা - নিয়ে এসেছিলো দু-জনের জন্য। - জয়দীপ অনন্যা -কে কিছু বলতে না দিয়ে উত্তর দিলো, ভাই আমি ই আগে গল্প করে নিলাম , বিয়ে তে আসতে পারিনি , তাই ভাবলাম তোর আসার আগে ভালো করে পরিচয় হয়ে যাক। আর তার শাস্তি স্বরূপ -লুচি , তরকারি -মিষ্টি কি নেই !!  এখন আমি শেষ করবো কি ভাবে সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ।
আবার বলছে দুপুরে খেতে হবে। 
অনন্যার প্রশংসা কতো ভাবে করা যায় ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলো না জয়দীপ , আর অনেক বছর বাইরে থাকায় বাংলা র  শব্দ ভান্ডার ও কমে গেছে , তাই হয়তো শব্দ ও খুঁজে পাচ্ছেনা। 
অনিকেত চা হাতে নিয়ে বললো, ছাড় , তোর খবর বল। 
এখন কি করছিস ? কেমন আছিস ?
জয়দীপ ও চা তুললো। 
একনাগাড়ে ঝড় তুললো দুজন , একজন মানুষ কে যে কয়েকজন ঠিকভাবে চিনতে পারে তার মধ্যে ছোটবেলার বন্ধু একজন। প্রকৃত মানুষটা কি সেটা সেই জানে।
অনিকেত আর জয়দীপ হারিয়ে গেলো গল্পের মধ্যে। 
রিপান অনেক বার চেষ্টা করেছিলো নিজের উপস্থিতি বোঝাতে কিন্তু সক্ষম হয়নি।
অনন্যা , মাঝে মধ্যে এসে দেখে গেছে।
গল্পের ঝড় যখন তুঙ্গে , হঠাৎ জয়দীপ যে কয়েকটা লুচি মিষ্টি প্লেট এ ছিলো তাড়াতাড়ি হাত লাগলো।
অনিকেত খেয়াল করলো, কি-রে , হঠাৎ কি হলো ?

জয়দীপ: আরে একটা কাজ মনে পরে গেলো। 

অনিকেত : দুপুরে খাবি তো ?

জয়দীপ : আজকে হবে না রে।  অন্য এক দিন। 
এরপর সময়টাও ঝট করে বেরিয়ে গেলো , মুহূর্তে উঠে পড়লো জয়দীপ , তাহলে আজকে যাচ্ছি বুঝলি , কাল পরশু আসছি। কাকিমা কোথায় আছে ? 
অনিকেত, মা মনে হয় পূজার ঘরে , দাড়া। 
না ,ভাই  কাকিমা র সঙ্গে দেখা হয়েছে , কাকু র সাথেও কথা হলো , আর অনন্যা র সাথে তো অনেক গল্প হলো। আজ আসি বুঝলি। - বলে জয়দীপ ব্যাগ টা সোফা থেকে তুলে নিলো, এই যে ম্যাডাম আমি বের হচ্ছি, পরে আসছি।- জোরে চিৎকার করে অনন্যা র উদ্দেশ্যে কথা রেখে বেরিয়ে পড়লো জয়দীপ।

তোমার বন্ধু কি যেনো একটা লুকোচ্ছে। অস্বস্তি হচ্ছিলো জয়দীপ দার। কিছু একটা ভেবেই চলছিলো। যতই গল্প করুক। 
অনন্যা এগিয়ে এসেছিলো বসার ঘরে জয়দীপ দা কে ছাড়ার জন্য। 
বসার ঘরে সোফা ঠিক করতে করতে বললো অনিকেত কে। 
অনিকেত বসার ঘরে টেবিল থেকে একটা বই তুললো , জয়দীপ প্লেট এর পাশে রেখেছিলো, তাড়া-হুড়োতে নিতে ভুলে গেছে।
ওরা যখন গল্প করছিলো , অনন্যা দু বার এসেছিলো। আর একজন কে এক- দু ঘন্টায় চেনা যায় না। 
তোমার হঠাৎ কেনো মনে হচ্ছে ?- অনন্যা কে প্রশ্ন করলো অনিকেত।

অনন্যা : আমাদের সম্পর্ক- টা অস্বস্তি -তে ফেলছিলো জয়দীপ দা কে। 

অনিকেত : তুমি কি করে জানছ ?

অনন্যা : অনুমান। লক্ষ। আর......

অনিকেত : আর। 
মধ্যে অনন্যা , কিছু বললো না , প্লেট- গুলো নিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো। 

অনিকেত ও কিছু বললো না , কিন্তু সত্যি জয়দীপ এর বিয়ে ভেঙে গেছে। তাও যাকে দশ বছর ধরে ভালোবাসতো।
অনন্যা -কে এ ব্যাপারে অনিকেত কিছু বলে নি। 
অবশ্য অনন্যা র এই  ক্ষমতা সম্পর্কে অনিকেত একবারে জানে না , এমন না ,  কয়েক- বার পেরেছে বুঝতে। খুব ধ্যান দিয়ে কিছু কে দেখে। 
একটা জেদ আছে অনন্যা মধ্যে। একবার অনিকেত এর সঙ্গে রাগারাগি হওয়ায় অনন্যা নিজেই ব্যাঙ্কিং সম্পর্কিত একটা জটিল ম্যাথেমেটিক্যাল প্রবলেম থেকে উদ্ধার করেছিলো। 
অনেক কিছু ছিলো অনন্যার , কিন্তু অবহেলায় পড়ে আছে সেই গুন্-গুলো। 
অনিকেত এর কাছে সব কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছে , এতো অসহায় কেনো মনে হচ্ছে নিজেকে ?
কোনোদিন ও এতো নিখুঁত ভাবে অনন্যা কে দেখা বা বোঝার চেষ্টা করেনি অনিকেত।
অনন্যার সব অসামান্য গুন -গুলো - ছিটকে ছড়িয়ে ছিলো।  এক জায়গায় কখনও এনে দেখেই নি অনিকেত।
আর আজকে যখন জয়দীপ অনন্যার প্রশংসা করে যাচ্ছিলো তখন যেনো অনন্যা র সব অসামান্য ব্যাপার গুলো অনিকেত এর চোখের সামনে ঘুরছিলো।
অনেক কিছু বেরিয়ে গিয়ে অনিকেত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে আসতে -আসতে।  এই প্রথম অনিকেত বুঝলো ফাঁকা হয়ে যাওয়া আসলে কেমন হয়। 
অনিকেত জোর করে , নাড়া দিয়ে উঠলো , কি দেখছে অনন্যা জানলা দিয়ে বাইরে ?
কি দেখছো ? অনিকেত জিজ্ঞেস করলো।

অনন্যা : দেখছি সামনের গাছের পাখি-টাকে।  একা , নিঃসঙ্গ যে এতো সুন্দর হতে পারে পাখিদের দেখলেই বোঝা যায়।  তাই না ?

অনিকেত কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে , জানলার কাছে এগিয়ে আসলো।

তোমার লেখা গল্প-টা ভালো হচ্ছে। অনন্যা এক দৃষ্টি-রেখে অনিকেত কে বললো।

--- তুমি পড়েছো আমার লেখা টা ? অনিকেত অবাক হলো। 

--- আমি চিনি তোমার  গল্পের দু -জন চরিত্র- কে। 

অনিকেত এর  শব্দ ভান্ডার  থেকে কোনও   শব্দ -ই  বেরিয়ে    আসলো না। 

অনন্যা : তোমার সব গল্পই  পড়ি। 
               টেবিল এর ওপরে রাখা গল্প -টা এবার শেষ করো। 
অনন্যা , একটা হাসি হাসতে -হাসতে চলে গেলো অনিকেত এর থেকে।

অনন্যা র এমন হাসি কি কখনও অনিকেত আগে দেখেছে ?  যাই হোক  আজকে অনেক হালকা লাগছে অনিকেতের। 
অনন্যা যেনো অনিকেত এর শরীর থেকে বিষ ঝেড়ে ফেলে দিলো।
ভালো লাগছে খুব। 

আর সবচেয়ে ভালো লাগছে , অনন্যা একটা পাপ করা থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেলো অনিকেত কে। নাহ অনন্যা এই গল্পের শেষ , তুমি সুন্দর। তুমি সুন্দর।

তুমি আকাশ -এর মতো , যেখানে আলো আছে , অন্ধকার আছে,
আর সবার জন্য রাখা আছে , অজানা বিষ এর এক ব্রম্ভান্ড। ।








Post a Comment

0 Comments