জয়ের ফুটবল - bangla short story

জয়ের ফুটবল

                                    কলমে : অন্তরাল

জয় গ্রামবাংলার ছেলে।আগাগোড়া সরলতা।নিস্পাপ মুখটা।শরীর জুড়ে ক্ষুধার তীব্র চাহিদা, হাত পা গুলো লিকলিকে। তবে , ফুটবলের জগতে ছেলেটা যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদ প্রাপ্ত ।অপরিসীম প্রতিভা ওর।বাবা শ্যামাচরণ দাস রিক্সাচালক।মা প্রতিমা দেবী এক হোমে কাজ করেন।জয়ের বোন ভাষা, সে জন্ম থেকেই মূক, পা দুটোও সমান নয় ।তবে ওর মূক মুখেও কেমন জানো একটা অনুভূতির অলীখ ভাষা আছে ।অভাব ওদের নিত্যসঙ্গী ।অভাবের তাড়নায় সেও সর্বদাই জরাজীর্ণ, ক্ষুধার জ্বালায় গর্ভ জ্বলছে ।গৃহবন্দী হয়েই থাকে সে, রাস্তায় বেরোলেই পাড়ার ছোকরা ছেলেদের তামাশার খোরাক হতে হয় ওকে।মেয়েটা সবসময়ই প্রায় নিজেকে নির্বাকতার করালগ্রাসে বলি দেয|

বাবা শ্যামাচরণ ও মা প্রতিমা দেবীকেও অনেক অবমাননা, লাঞ্ছনা, সহ্য করতে হয় মেয়ের এই অক্ষমতার জন্যে।দিনকে দিন ওদের সংসারে অভাব বাড়তে থাকে, অনাহারে দিন যায়, কোনোদিন বা আধপেটা হয়ে থাকে ।শ্যামাচরণ বাবু অসুস্থ হয়ে যান।ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।গ্রামবাসীদের সহায়তায় কোনোক্রমে কাজ টা ওঠে।এদিকে মায়ের কাজটাও চলে যায়, হোমের গেটে তালা ঝোলে।পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে পড়ে ।বর্ষা আসে, ভগ্নস্তূপে পরিণত হয় মাটি আর খড়ের ছোট্ট ভাঙা বাড়িটা।তিনটে প্রাণ খোলা আকাশের নীচে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হেঁটে চলে।ভোরের ট্রেনে চেপে কলকাতায় আসে ওরা, কাজের আশায়, খাবারের খোঁজে ।প্রতিভাগুলো চাপা পড়ে যায় ।ফুটপাথে রাত কাটে ।রাতের শহরে খোলা আকাশের নীচেই ঘুমোই ওরা, ওদের মতন আরও গৃহহীন অনাহারী মানুষের ভীড়ে ।

একটা কাজের সন্ধান মেলে বড়োরাস্তার ধারে, চা-দলখাবারের দোকানে।দুমুঠো খাবারের জোগান হয় ।দোকান মালিকের সহৃদয়তার বশে ফুটপাথ ছেড়ে দোকানেই রাতের আশ্রয় হয় অসহায় মানুষ তিনটের।বড়োরাস্তার পাশেই ফুটবলের মাঠ।সব বড়োঘরের ছেলেরা নিত্য সেখানে এসে প্রাক্টিস করতে ।জয় অবসরে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখে.. রাতের স্বপ্নে দেখে সেরা ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন ।কিন্তু রাতের শহর ঘুম ভাঙার আগেই ওগের উঠে পড়তে হয় উনুন ধরানোর জন্য, অফিস যাত্রীদের ভীড়ে ব্যস্ততাময় সকাল কাটে।পুচকে ছেলেটা বেশ আপ্যায়ন ও করে ।সবার বেশ পছন্দের হয়ে গেছে ও।

হঠাৎ একদিন বদল ঘটে ওর জীবনে ।পাঁচিল ঘেরা মাঠ পেরিয়ে, গোলপোস্টের পেছন দিয়ে বল চলে আসে বড়ো রাস্তায় ।জয় ছুটে যায়, বলটা কুড়িয়ে নেয়, বল ফেরত দেওয়ার অজুহাতে মাঠের ভেতরে ঢোকে।ঘাসের ওপরে বলটা রেখে দৃঢ় প্রত্যয়ের সহিত বলটা ছোড়ে.. কোচ একটু দূরেই দাঁড়িয়ে, সে বিস্ময়ের সহিত বলটার দিকে তাকিয়ে.. বলটা মাটি স্পর্শ করামাত্রই সে চিৎকার করে উঠলো "ব্রেভো, ব্রেভো! হো়য়াট এ সট! "বহুদিনের পর একটু বল ছোঁয়ার সুযোগ মিললো, ওদের মতোন জীবনে আর এগিয়ে চলার স্বপ্ন থাকে না, এখানেই ইতি!

কিন্তু ওরক্ষেত্রে হল অন্যরকম, তাই বোধহয় গল্পটা লেখা ।অবসরে কোচের তত্ত্বাবধানে প্রাক্টিস শুরু করলো।কোচ সঞ্জীব দত্ত, অমায়িক মানুষটা ।জয়ের কাছে তিনি ঈশ্বর ।এগিয়ে চলে ওর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ।ভাগ্য ওর সাথে প্রতারণা করেনি।তাই তো আজ গণশক্তি থেকে বর্তমান, কাগজের শিরোনামে জয় দাস, ভবিষ্যত ফুটবলের রাজপুত্র ।মাঝমাঠে থেকে তার আক্রমণ প্রশিক্ষক, গোলরক্ষক, রক্ষন সবাইকে বিষ্মিত করে।জয়ের গলায় বিজয়মাল্য, হাতে আই. এফ. এ চ্যাম্পিয়ন ট্রফি।মা ছবিটা দেখছেন, তার চোখে আনন্দের জল।

ফুটবলের রঙে সে রঙিন।সালটা যখন ১৮৭৭ কোনো এক শীতের ভোরে বালক নগেন্দ্রপ্রসাদ তার মায়ের সঙ্গে গড়ের মাঠ দিয়ে গঙ্গা পাড়ে গিয়েছিলেন ।দৈবাৎ তাদের ঘোড়ার গাড়ির সামনে একটি চামড়ার গোলাকার বস্তু আসে।বাচ্চাটা সেই বস্তুতে সজোরে লাঁথি মেরে ইংরেজ খেলোয়াড়দের কাছে ফেরত পাঠান।বাংলা গর্বিত হয়েছে এরকম বহু স্বনামধন্য খেলোয়াড়দের পায়ের জাদুতে।আজ আর এক নতুন নাম আসলো-জয় দাস ।অজস্র বাঙালীর ইমোশনে জড়িয়ে ফুটবল।বাংলা ছাপিয়ে বিশ্বহৃদয়ে জায়গা করুর জয়, তার চলার পথে অনেক শুভেচ্ছা রইলো, সে আবারও প্রমাণ করুক"সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল"





Author: অন্তরাল

Post a Comment

0 Comments