এটাই জীবন - Bengali Love Story | Part - 01



এটাই জীবন - Bengali Love Poem

সাঁঝবাতির আলোটা দমকা হাওয়ায় বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে। অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। পাখিদের কলকাকলি এখন আর নেই। চারিদিকে গভীর নিস্তব্ধতা বিরাজমান।  হঠাৎ মেঘের তীব্র গর্জন আর সেই সঙ্গে ঝোড়ো হিমেল হাওয়ায় সঞ্চিতার চঞ্চল মনে ভয়ের সঞ্চার হল। সাঁঝবাতিটা দমকা হাওয়ায় নিভে গেছে। সঞ্চিতা হাতড়ে হাতড়ে মনের আন্দাজে সন্তর্পনে বারান্দা থেকে ঘরে এল।এখানে আকালে মেঘ জমলেই বিদ্যুৎ এর সাপ্লাই চলে যায়। একটা পুরোনো চার্জার লাইট গত মাসে বিশাল এনেছিল আড়াইশো টাকা দিয়ে। সেটা জ্বালাতেই একটা কাতর স্বরে আওয়াজ ভেসে এল।


-বিশাল এল?
- না মাসি।
- আজও এল না।
একটা দীর্ঘশ্বাস । সঞ্চিতা জড়সড় হয়ে খাটের কোনায় বসল। পাশেই টেবিল। চার্জার টা টেবিলে রাখল নিঃশব্দে। একটা বাঁধানো খাতা । একটা কলম। সঞ্চিতা কলম তুলে কি যেন লিখতে ব্যাস্ত হল। একমনে , আবার আনমনা।
- কি লিখিস রে মা এত?
- না মাসি এই হয়ে গেছে।
- এই সময় এত লেখালেখি দিয়ে কাজ নেই। একটু শুয়ে থাক।
- হ্যাঁ মাসি।
- বিশাল টাও আসছে না। খবর ও দিচ্ছে না ।( শেষের কথাগুলো যেন আনমনেই বলে চলল)
- মাসি তুমি কোনো চিন্তা করো না ও ঠিক আসবে।
- কবে যে --
বাইরে দরজায় ঠকঠক শব্দ হল। সঞ্চিতা চকিতে দরজার দিকে তাকালো। চোখদুটো চকচক করে উঠল। উঠে গিয়ে দরজা খুলতে ই চমকে উঠল সে।
- কে?
কোনও সাড়া নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর সেই সঙ্গে ঝড়ের প্রলয় নাচনে শান্ত প্রকৃতি আজ অশান্ত রূপ ধারন করেছে। এক ঝলক বিদ্যুৎ এর আলোয় যেন দেখল কেউ একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে কামিনী ফুলগাছের নীচে। ঘুটঘুটে অন্ধকার এ আবার সবটা ঝাপসা। ঘর থেকে চার্জার টা এনে দরজার সামনে এল । না কেউ নেই । পশ্চিম দিকের বাদাম গাছটা ঝড়ে পড়ে গেছে। ছনে ছাওয়া বারান্দার একপাশে সেই বাদাম গাছের মাথা পড়েছে । তখনই ঐ আওয়াজ এসেছে । ভ্রম। কিছুটা নিশ্চিন্ত হল।
দরজা লাগিয়ে ভেতরে এসে বসল সঞ্চিতা। ঠান্ডা লাগছে। তারই অস্তিত্ব যে তার গর্ভে বেড়ে উঠছে প্রতিক্ষনে সেই অনুভূতি ব্যাক্ত করছে। শতছিন্ন একটা চাদর জড়িয়ে নিল । চিনচিনে একটা ব্যাথা তার তলপেটের নীচে থেকে শুরু হয়েছে। তলপেটে হাত দিতেই একটু কমল যেন। আবার বসল সেই বাঁধানো খাতা নিয়ে। মুখে কষ্টের অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে প্রতিনিয়ত। তবুও যেন কি এক কর্তব্য পালনের নেশায় লিখে চলেছে। জটিল হিসেব নিকেশের অংক কষে চলেছে সে। বাইরে ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টির তান্ডব শুরু হয়েছে। প্রকৃতি যেন আজ মন খুলে কাঁদছে। সমস্ত দূঃখ কষ্ট বেদনা আজ যেন উজাড় করে দিচ্ছে। 


পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো সঞ্চিতার। সমস্ত গ্রাম জুড়ে ঝড়ের তান্ডব লীলায় সব লন্ডভন্ড। তবুও প্রকৃতির রূপ , রং , বৈচিত্র্য কমেনি বরং বেড়েছে। নদীর ওপারে উদিয়মান সূর্যের রক্তিম আভায় আলোকিত হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। ছোট ডিঙি নৌকায় চেপে জাল ফেলে মাছ ধরায় ব্যস্ত জেলে। সঞ্চিতা ধীর পায়ে বাইরে এল। জোলো হাওয়ায় এলোচুল অবিন্যস্ত হয়ে উড়ছে। এ এক অপূর্ব অনুভূতি। 
- দিদি?
চমকে পেছনে তাকাল সঞ্চিতা। একটা দীর্ঘশ্বাস ।
- চল।
- তুই দেখিস , ঠিক খুঁজে বের করব।
- পান্তা আছে, খেয়ে নে।
- কে রে , বিশাল এলি নাকি? এতক্ষণে তোর আসার সময় হল? (শুষ্ক , রুক্ষ কাতর কন্ঠস্বর ভেসে এল )
কোনও জবাব নেই ।
নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করে বাইরে এল বিশাল । খানিকক্ষণ বসল বারান্দায় রাখা পায়া ভাঙা চেয়ারটার ওপর। তারপর জাল কাঁধে বেরিয়ে গেল বাইরে। 
 সঞ্চিতা কিছুই বলল না । শুধু নিঃশব্দে নিজের কাজ করতে লাগল।


(২)


 মৃত্যুঞ্জয় এর  কাজ দেখে জেল কর্মকর্তা বেশ খুশি । তিনি ভেবেই পাচ্ছেন না যে মৃত্যুঞ্জয় এর মত একটা ছেলে কিভাবে একটা খুন করতে পারে । কিংবা হতে পারে মৃত্যুঞ্জয় একটা কোল্ড মার্ডারার। এই মিষ্টি আলাপের ছোঁয়ায় ভূলিয়ে দিয়ে আইনের প্যাঁচ থেকে বেরোতে চায় সে। যাই হোক ।সে তো সি আই ডি নয় । তদন্ত করা তার কাজ নয়। 


-সাব , চা।
-বড়বাবু এলেন নাকি রে নগেন?
- হ্যাঁ সাব।
- শোন চায়ে চিনি কম দিবি একটু ।
- আচ্ছা সাব ।


নগেন এই জেলে চা দেয় । দশ বছর ধরে দেখছে  জেলার তাকে। চেহারা রোগা মতন , ব্যবহার চমৎকার, একটা নমনীয় ভাব আছে। কোনও দিন ঝগড়া করতে দেখে নি কারও সাথে। এই নগেনই তাকে বাঁচিয়েছিল সেই ভয়ানক রাতে । উফ্!


 কিন্তু নগেনকে ভালোই সম্মান করে । নগেন চা দিতে এলে তার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্পও করে । নগেনই জেলারকে বলেছিল , মৃত্যুঞ্জয় ভালো ছেলে। খুন সে করেনি তাকে ফাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। জেলার তখন পাত্তা দেয়নি , তবে এখন জেলার সাহেব মৃত্যুঞ্জয়ের ব্যবহার , নমনীয়তা দেখে তারও মন বলছে মৃত্যুঞ্জয়কে ফাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। টাকায় কি না হয় ! কাল কোর্টে যাবে মৃত্যুঞ্জয়ের কেস , যেখানে মিথ্যে জয়ী টাকার ওজনে।


হঠাৎ ই বড়বাবু ঢোকেন জেলে , জেলার চমকে উঠে দাঁড়ায়। স্যালুট করে বড়বাবুকে। 
-দশ নম্বর সেল খোল তো।
-আজ্ঞে , হুজুর।
জেলার দশ নম্বর সেল খুলে দেয় , দশ নম্বর এর কয়েদি ছিনতাই করে ধরা পড়েছে। বড়বাবু দুজন কনস্টেবল কে ভেতরে গিয়ে পেটানোর নির্দেশ দেয়। আবার হুকুম আসে, 
-চৌদ্দ নম্বর সেল।
খুলে যায় চৌদ্দ নম্বর । কিন্তু বড়বাবু এবার নিজেই ভেতরে যান। একটা চেয়ার ভেতরে আগে থেকেই রাখা আছে। বড়বাবু চেয়ারটেনে বসলেন।সামনে মৃত্যুঞ্জয়কে বসতে বলেন। মৃত্যুঞ্জয় এসে বসে।
-তোমার সাথে কিংকর বাবুর কি সম্পর্ক?
-কে কিংকর?
-সে কি তুমি তাকে চেন না!
-না স্যার।
-এই গৌতম।(চিৎকার করে ওঠে বড়বাবু)
গৌতম হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢোকে। 
-এক্ষুনি ক্যামেরা নিয়ে এস।
-আচ্ছা স্যার।
গৌতম চলে গেল ক্যামেরা আনতে। বড়বাবু মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে আবার ঘুরে বসলেন।
-মৃত্যুঞ্জয় , তোমার কথা এই দুদিন যত শুনছি ততই অবাক হচ্ছি। তার থেকে ও বেশি অবাক হচ্ছি তোমাকে দেখে। যাইহোক আমার প্রশ্নের উত্তর সঠিক ভাবে দেবে , হয়তো তোমাকে এই বিশ্রী খেলা থেকে মুক্ত করতে পারব।


আড়াই ঘন্টা ধরে মৃত্যুঞ্জয়ের জবানবন্দি নেওয়া হল। খুন যে মৃত্যুঞ্জয় করেছে এই ব্যাপারে আগেও কেউই একমত ছিল না । এখনও নয়। বড়বাবু মৃত্যুঞ্জয় কে সম্পূর্ণ আস্থা দিয়ে গেল , যে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। জেলার ও বড়বাবুকে খুব শ্রদ্ধা করেন এই ব্যাপারে, কারন বড়বাবু একজন ভদ্র এবং সৎ ব্যক্তি। আইনকে খুব শ্রদ্ধা করেন । মৃত্যুঞ্জয় কিন্তু আশ্বস্ত নয়।


(৩)


শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদ নারকেলের কচি পাতা ছুঁয়েছে। তালগাছের পাতায় হালকা হাওয়ার পরশে করকর আওয়াজ হচ্ছে। গ্রামীণ সমাজের  কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব এটাকে ভূতের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করেছে। প্রবীণ প্রবীর বাবু গ্রাম্য শিক্ষক । তিনি অনেকবারই শহরের ভালো ভালো স্কুলে পড়ানোর প্রস্তাব পেয়েছেন , মাইনেও মোটা প্রায় তিন চার গুন । যাননি । কেন যাননি , তা জিজ্ঞেস করলে বলে, গ্রাম ছেড়ে যেতে মন চায় না । এখানে প্রান ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায় । মন খুলে কথা বলা যায় । আর কে কি বলবে? প্রধান কাজ হল গ্রামের সবাইকে মানুষ করে গড়ে তোলা। সবার খোঁজ খবর নিতেও ভোলেন না উনি। বিপদেও সমস্ত গ্রামবাসীর একমাত্র আশ্রয়স্থল প্রবীর বাবু।


প্রায় প্রতিদিন বিকেলে প্রবীর বাবু তার প্রিয় নৌকা নিয়ে ভ্রমণে বের হন।নদী থেকে নৌকা এগিয়ে চলে । ঢেউয়ের তোড়ে নৌকা দুলতে থাকে। কখনো নৌকা সরু খাল বেয়ে এগিয়ে চলে। দুপাশে বাহারি বুনো ফুলের গাছ। বিকেলের রোদে তাদের হাসির ঝিলিক দেখতে দেখতে প্রবীর বাবু স্মৃতি রোমন্থন এ ব্যাস্ত হয়ে পড়েন।হয়তো কোনোদিন সন্ধ্যা নামে , কোনও দিন হয়তো পাখিরা ঘরে ফেরার সময় সচেতন করে যায়, চিন্তায় ছেদ ঘটে। আজও তাই হল । একঝাক টিয়া এসে তাদের সদ্য লেখা গান শুনিয়ে গেল। 


বাইরেটা এখনও অন্ধকারে ঢেকে যায়নি । আলো এখনও আছে। পশ্চিমে সূর্যের লাল আভা এখনও মেঘের কোনে লেগে রয়েছে। ঝপ করে কাছেই একটা শব্দ হয়। জলে কিছু পড়ল মনে হয় । প্রবীর বাবু সেদিকে তাকিয়ে দেখে বিশাল জাল টেনে তুলছে । জালে একটা বড় শিঙি মাছ পড়েছে। আর সব ছোট ছোট চিংড়ি র ছানাপোনা। এগিয়ে গেলেন প্রবীর বাবু।


-কেমন পেলি , আজ?
-স্যার ,কেমন আছেন ?
- হ্যাঁ, ভালো।
-মাছ , আজকে যা পেয়েছি তা এই দিকেই। এই যে ।
বিশাল তার মাছ রাখার পাত্র দেখায়। দুটো রুই , চারটে কৈ, আর একটা শিঙি, আর সব চিংড়ি র ছানাপোনা।
-বাহ বেশ বেশ। তা বাড়ির খবর কি ?
-চলছে , যেমন চলছিল।
-বিশাল কি এখনও ফেরেনি?
-নাহ! এদিক সেদিক তো খোঁজ লাগিয়েছি।
-বিশাল তো ভালো ছেলে । এরকমটা…..
-আমরাও বুঝতে পারছি না স্যার।
-আচ্ছা , চল সন্ধ্যে হয়ে এল । উঠে আয়।


(৪)


-এখানে মৃত্যুঞ্জয় বলে কেউ আছে।
-হুম, আছে । খুনের আসামী।
-দেখা করব । 
-পরিচয়?
-ওর উকিল।
জেলার যেন হকচকিয়ে যায়। মনের মধ্যে অনেক চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। কে বিশাল? যার জন্য অচেনা শহরে তার পক্ষে কেস লড়ার জন্য উকিল তৈরি থাকে। কোনও বড় গ্যাঙ নয় তো এর পেছনে। মৃত্যুঞ্জয়ের সারল্যকে কাজে লাগিয়ে পরপর একটার পর একটা অপরাধ করে যাচ্ছে। কিংবা……
-কি হল কি ভাবছেন?
-পারমিশন?
-এই নিন।
-চলুন আমার সঙ্গে।
জেলার গিয়ে চৌদ্দ নম্বর সেল খুলে দেয় । আর সময় দেয় পাঁচ মিনিট। মৃত্যুঞ্জয় ঘুমিয়ে আছে ‌। এই অসময়ে কেন তা জেলার বা তৃতীয় জন ও ধরতে পারে না । জেলার চলে আসে একগাদা চিন্তার জট মাথায় নিয়ে ।


-দাদা?
-কে?
মৃত্যুঞ্জয় চোখ খুলে দেখে , চমকে ওঠে ।
-তুই এখানে । ইন্দিরা বোন আমার একথা যেন কোনোভাবেই বাড়ি না পৌঁছায় । তাহলে…..
-তুমি কি তাহলে সত্যিই খুন করেছ?
-তুই ও বিশ্বাস করলি?
-আমি উকিল দাদা , সবদিক থেকে ভেবে দেখাটাই আমার কাজ।
মাথা নাড়ে মৃত্যুঞ্জয়।
-আচ্ছা , তুমি প্রথম থেকে সবটা বল তো ।
-কি করবি শুনে , কোনও লাভ নেই রে।
-না , তোমার কেস আমার স্যার লড়বে । কিংকর বাবুকে এবার একটা যোগ্য জবাব দিতেই হবে।
-কে এই কিংকর বাবু?
-এই এলাকার সবচেয়ে কুখ্যাত একজন।
-হুম।(দীর্ঘশ্বাস পড়ে)
-আচ্ছা , এবার বল , আমি সবটা রেকর্ড করে নিচ্ছি।
মৃত্যুঞ্জয় বলতে আরম্ভ করে তার জীবনের চরম বিপর্যয়ের ঘটনা।



চলবে....

Post a Comment

0 Comments