শালু

দোতলার ব্যালকনিতে বসে স্কুল মাস্টার সৌতিক বর্মন গভীর আলস্যে চা পান করতে করতে শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদে কর্মব্যস্ত মানুষদের প্রত্যাবর্তন নিরীক্ষণ করছিলেন


দোতলার ব্যালকনিতে বসে স্কুল মাস্টার সৌতিক বর্মন গভীর আলস্যে চা পান করতে করতে শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদে কর্মব্যস্ত মানুষদের প্রত্যাবর্তন নিরীক্ষণ করছিলেন।তার ছয় বছরের অতি আদরের মেয়ে মিলি গুটি গুটি পায়ে মেইল গেটের দিকে এগিয়ে গেল।গেটের ওপাশে মিলির সমবয়সী একটা রাস্তার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।যার সারা গায়ে ধূলো বালি ভর্তি , রূক্ষ চুল, পরনে একটা হাফপ্যান্ট, গেঞ্জি।তাও শতছিদ্র।তবে এইসব অনাকর্ষনীয়তার ভেতরেও একটা আকর্ষণীয় বস্তু ছেলেটার ছিল। আর সেটি হল ছেলেটির হাসিমাখা সুন্দর মুখটি।

টুক করে মেইন গেটটা খুলে দিল মিলি।রাস্তার সেই রুগ্ণ নোংরা ছেলেটি ভেতরে প্রবেশ করল।মিলি এবার , তার সবচেয়ে প্রিয় লাল বলটি ছুড়ে দিল ছেলেটার দিকে। একটা অপূর্ব ভঙ্গিতে ছেলেটি সেটা লুফে নিল।সৌতিক এই দুই অসম মেরুর প্রানির খেলা খুব মনোযোগ সহকারে উপভোগ করছিল। আর ফেলে আসা মুখর দিনের কথা ধীরে ধীরে মনে পড়তে লাগল। --- ভর দুপুরে নৌকায় চড়া, চুরি করে মাছ ধরা, পেয়ারা খাওয়া, সারাদিন না খেয়ে ঘুরে বেড়ান, আরও কত কি!

পূজা সৌতিকের স্ত্রী মিলির মা। সে ঘরের কাজ শেষ করে সৌতিকের কাছে এসে বসল।
--শুনছ?
সৌতিকের চিন্তার ছেদ ঘটল।খানিকটা চমকে উঠে বলল---
--হুম বল।
--বলছি মানে। ইয়ে। আজ একবার শপিং মলে চল না।
--কেন?
--না মানে । মিলির কিছু জামাকাপড় কিনতে হবে।
--সেদিনই তো কতকিছু কিনলে?
--ইয়ে মানে। আমি একটা জামদানি কিনব।
--ও তাই বল, জামদানি কিনবে। আচ্ছা জামদানির ব্যাসবাক্য কি হবে? হুম। মনে পড়েছে । জাম যে পাত্রে রাখা হয়।সমা----।
--ধ্যাত্তেরিকি। শপিং এর কথা উঠলেই কথা ঘোরাতে থাক।
--না মানে বলছিলাম যে-------------------।

সৌতিক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মিলির হাসির শব্দে বলতে তো পারলই না বরং দৃষ্টিটা নিচে নামাতে বাধ্য হল। পূর্বের বাকবিতণ্ডাতে পূজার মাথাটা গরম হয়েই ছিল।তারপর আবার কঙ্কালসার একটা রাস্তার নোংরা ছেলের সাথে মিলিকে মেঝেতে বসতে দেখে আরও রেগে গেলেন। সে দ্বপ করে জ্বলে উঠল।

--মিলি , কি হচ্ছে ওখানে?
--খেলছি মা।অত্যন্ত উৎফুল্লের সহিত জবাব দিল মিলি।
--তোমাকে না বলেছি ওসব ছেলের সাথে মিশবে না।
মিলি নিরুত্তর । অধোবদনে উঠে দাঁড়াল।তার কোমল ফর্সা হাতের মাঝে ছেলেটির অপুষ্ট নোংরা হাত তখনও আবদ্ধ।

--এক্ষুনি উপরে এস।
মায়ের কড়া স্বর শুনে মিলি ভয় পেয়ে গেল।ছেলেটির হাত ছেড়ে ধীরে ধীরে মিলি উপরে উঠে এল।ছেলেটিও বেরিয়ে গেল।

--তোমাকে বারন করার পরেও তুমি কেন ওসব ছেলের সাথে মিশছ?
-- ও ভালো গল্প বলে মা।
-- আবার তর্ক হচ্ছে।
পূজা একটা সশব্দ চড় কশাল মিলির নরম তুলতুলে গালে।কোমলমতী মিলি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার বাবার কোলে মুখ গুজে দিল। এটা সৌতিকের মর্মে গিয়ে বিঁধল।

--পূজা, তুমি কিন্তু লিমিট ক্রস করে যাচ্ছ।যখন যা ইচ্ছে তাই করে চলেছ।
--মানে?
--মেয়েটাকে মারলে কেন?(মিলির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল)
--বাহ্ অবাক করলে বড়।মেয়ে একটা ফুটপাথের ছেলের সাথে খেলবে, আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাসা দেখব? এদের বাবা মা ও না -- -- - -- -। হুম্। ছেলেকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছে।
--ওর কেউ নেই মা ( মিলি কাঁদতে কাঁদতেই বলল )
--থাক । তোমাকে আর ওর হয়ে ওকালতি করতে হবে না । ডিসগাসটিং।
সন্ধ্যার এমন তিক্ত উপহারের পর রাতটাকে কোনওমতেই উপভোগ করতে পারলেন না সৌতিক বর্মন।সারারাত বিষন্ন বদনে অনিদ্রায় কাটল তার। এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যে সূয্যিমামা পুবাকাশ উজ্জ্বল করেছে , বুঝতেই পারেনি।সারারাত যতবারই চোখ বন্ধ করেছে ততবারই ভেসে উঠেছে বাপ মা হারা ছেলেটির অনাহারক্লিষ্ট মুখ। অথচ একটুকরো মায়াময় হাসি মুখে সর্বদা লেগেই রয়েছে।নিজের অজান্তেই নিজের সাথে কথা বলতে লাগল সে।

--ওর নামটা কি?হ্যাঁ । মিলি নিশ্চয়ই জানে।আজ জিজ্ঞাসা করতে হবে।

পূজা সকালের ব্রেকফার্ষ্ট তৈরি করেছে।মিলি হরলিক্স খেয়ে পড়তে বসেছে। মিস্টার সৌতিকও ইতিমধ্যে ফ্রেশ হয়ে মিলির পাশে এসে বসেছে।অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে মিলিকে ডাকল সে।

-- মিলি।
-- হুম্।(মিলিও স্বরের উত্তাপ বজায় রাখল)
-- ঐ ছেলেটার নাম কিরে ? জানিস কিছু?
-- শালু।
-- ওর কি কেউই নেই?
-- না বাবা । সত্যিই ওর কেউ নেই।(মিলি গোমড়া মুখে বলল)
-- ও কোথায় থাকে জানিস?
-- হুম্।
-- কোথায় থাকে?( সৌতিক জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল)
-- ও তো বলে ফুটপাথে থাকে।জান বাবা ফুটপাথে সন্ধ্যায় ঘুমালে নাকি ওর পেটে লাথি মারে, নাকে ঘুসি মারে।কালও নাকি ওকে মেরেছে।ওর নাকের চারপাশে রক্ত লেগে আছে এখনও।

মিলি মিথ্যা বলছে না। কারন সৌতিকের সামনে এই ঘটনা পুরোন নয়। এই শহরেই তার বাস। এইসব ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটেই চলেছে। সে কোনও ঝামেলায় জড়াতে চায়নি। কিন্তু আজ! শালু ছেলেটাকে দেখলেই তার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। সে আবার বলল--------।

-- ও সারাদিন কি খায় জানিস?
-- ও তো বলে কোথায় একটা বড় হোটেল আছে। সেখানে ও সকালে উঠেই চলে যায়।ওর মত আরও অনেকেই যায়।বাসনগুলো পরিস্কার করে দিলে ওরা খেতে দেয়।জান বাবা ও বলল সেই হোটেলও নাকি দুদিন বন্ধ।কাল ও কিছুই খায়নি। ওর কত কষ্ট হচ্ছে।না বাবা?

ছোট্ট মেয়ে মিলির এলোপাথাড়ি কথাগুলো আনমনে শুনছিল সৌতিক।মিলি এত খবর রাখে একটা অসহায় ছেলের ব্যাপারে।আর সে এতদিন------। ধিক। কি যে খায় শালু তা সে জানে। ঐ হোটেলর দুদিন আগের পচা খাবার।গত দুদিন হয়তো তাও পেটে পড়েনি বেচারার। অতি কষ্টে প্লাবন রোধ করে বসে আছে সে। সামান্য আঘাত পেলে আর বাধ মানবে না।
-- বাবা।
-- উম্। হুম। (সে ধরা গলায় বলল)
-- ও আরও কি বলে জান ?
-- কি বলে?
-- ও বলে যে, আমরা খাওয়ার পর যে খাবার ফেলে দিই, তাই যদি আমি ওকে দিতে পারি তাহলে আরও গল্প শোনাবে।

একফোঁটা তপ্ত অশ্রু সৌতিকের কোলের উপর পড়ল।সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।টাওয়েল দিয়ে দুই চোখ মুছে সে আবার বলল------

-- ও কি প্রত্যেক বিকেলেই আসে?
-- হ্যাঁ । আজ তো রবিবার সকালেও আসতে পারে ।
-- আচ্ছা শালু তোকে কিসের গল্প বলে?
-- ও দৈত্য দানোর গল্প বলে।জানো বাবা ওর গল্প শুনতে খুব মজা লাগে।
-- মিলি?
-- হুম্।
-- আজ মল্লিকাদের বাড়ি না গেলে কেমন হয়?
-- তাহলে তো খুবই ভালো হয়।(মিলি আনন্দের অতিশায্যে হাততালি দিয়ে উঠল)

আরও কি বলতে যাচ্ছিল সৌতিক। কিন্তু পূজার আকস্মিক প্রবেশ এবং তার কন্ঠস্বরে থেমে গেল সে।

-- বাপ মেয়েতে কি প্লান চলছে?(পূজা হাসতে হাসতেই বলল)
-- সিক্রেট। মিলি তোর মাকে বলবিনা কিন্তু।
-- ঠিক আছে বাবা ।( মিলি যেন একঝটকায় বুঝে নিল)
-- হুম্। ব্রেকফার্ষ্ট তো করতে হবে নাকি সারাদিন প্ল্যান করেই কাটবে?
-- মিলি চল চল আগে ব্রেকফার্ষ্ট করে নিই। তারপর--------। ( বলে একটুখানি হাসল সৌতিক)
-- হ্যাঁ বাবা।মিলিও উৎসাহের সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে তার বাবার হাত ধরল।

নীরবে ব্রেকফার্ষ্ট সমাপ্তের পর পূজা বলল-----

-- মিলি তাড়াতাড়ি এস তোমার ফ্রকটা পরিয়ে দিই।

মিলির হাসিখুশি মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল।সে তার বাবার চোখের দিকে মিটিমিটি তাকাল।সৌতিক ভাবছিল পূজাকে কথাটা কিভাবে বলবে।তার সমাধানও খুজে পেল মিলির চাহনিতে। কতকটা সামলানোর ভঙ্গিতে বলল----

-- প্ল্যানটা বলি তাহলে । কি বলিস মিলি?
-- হুম্। (মিলিও হাসিমুখে মাথা নাড়ল)
-- কিসের প্ল্যান?
-- না মানে , বলছিলাম যে, আজ আমরা মল্লিকাদের বাড়ি যাচ্ছি না।
মিলি কিন্তু চুপিসারে তার বাবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

-- কেন? বিয়ের পর কোন রবিবার আছে , যে তোমার শ্যালিকার মুখ দেখনি?
-- হুম। সেজন্যই তো আজ যাব না। প্রতি রবিবার তোমার বোনের বাড়িতে টেলিভিশনে মুখ গুঁজে বসে থাকা আর রস-কষহীন আধবুড়ো জামাইবাবুর সঙ্গে পার্টির আলোচনা করতে ভাল লাগে না।তাই আমরা যাচ্ছি না। তোমার যদি একান্ত ভাল নাই লাগে তাহলে তুমি যাও।
-- মিলি না গেলে মল্লিকাতো আমাদের বাড়ি চলে আসবে।
-- আহা , আসতে দাও না। আমরা যাচ্ছি না ব্যাস। কি বলিস মিলি?

মিলি ভয়ে ভয়ে পূজার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।বাবার শার্টের কোন তার হাতে আবদ্ধ। পূজা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন। অবশেষে পূজা একাই রওনা দিল বোনের বাড়ি।


*************************************

দোতলার ব্যালকনির সেই চেয়ারটাতেই বসে আছে সৌতিক।হাতে তার দৈনিক পত্রিকা। পড়ছে না মোটেও। পড়ার ভান করছে মাত্র। এক অজানা আকর্ষণে সদর দরজায় তার সন্ধানী দৃষ্টি বারবার উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।মিলি মনের আনন্দে ল্যপটপে গেমস খেলায় ব্যাস্ত।কার প্রতিক্ষায় যে আছে সৌতিক সেটা বোঝা গেল একটু পরে।গতকালের সেই ছেলেটি আজ আবার এসেছে।দরজার ওপাশে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে।অবাক ব্যাপার! দরজার আগল খোলা, তবুও ভেতরে ঢুকল না।হাতের ছোট্ট লাঠিটা দিয়ে লৌহদন্ডের ওপর একটা আঘাত করল।ঢং করে একটা শব্দ হল।ছেলেটার কান্ডকারখানা এবং বুদ্ধির বহর দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল সৌতিক। মিলি ওদিকে গেমসে ডুবে আছে।তার কানে ঐ শব্দ সংকেত তখনও পৌঁছায়নি। সৌতিক কাগজ রেখে মিলিকে ডাকল।


-- মিলি?
-- হ্যাঁ। বল।
-- ঐ দ্যাখ শালু এসেছে।(আঙুল দিয়ে নির্দেশ করল)

মিলি শালুকে দেখামাত্রই ল্যাপটপ ছেড়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।

-- সাবধানে যা।( চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল)

মিলি ছুটে গিয়ে মেইন গেটটা খুলে দিল । শালু ভেতরে প্রবেশ করল।


শালু আর মিলি গল্পে রত। সেই নোংরা মেঝেতে গ্যাঁট হয়ে বসে ওরা শিশুসুলভ কথোপকথনে ব্যাস্ত।সৌতিক মুগ্ধ বিস্ময়ে উপর থেকে দেখছে।


-- কাল তোমার মা বকেছে?
-- হ্যাঁ।
-- কেন?
-- তোমার সঙ্গে খেলা করি তাই।
-- তাহলে তো আজও বকবে?
-- না, না। মা আজ বাড়িতে নেই তো।
-- কোথায় গেছে?
-- মনিমার বাড়ি।
-- তুমি একা বাড়িতে?
-- না ।বাবা আছে।
-- তোমার বাবা বকবে না?
-- না । বাবা বকে না। বাবা খুব ভাল।


এমন সময় সৌতিক দুটো ক্যাটবেরি হাতে এগিয়ে এল ওদের দিকে। শালু তো দৌড়ে পালাতে যাচ্ছিল।সৌতিক বলল----

-- ভয় নেই শালু। আমি কিছু বলব না।এই নাও ক্যাটবেরি।


উত্তেজনা আর ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে শালু।সেই কাঁপাকাঁপা হাতে ক্যাটবেরিটা নিল।মিলি তো ক্যাটবেরি নিয়েই খেতে শুরু করেছে। শালু ধীরে ধীরে ক্যাটবেরির প্যাকেট খুলল।ছোট্ট একটা বাকেট ভেঙে মুখে পুরল। এমন একজন হৃদয়বান মানুষকে সে প্রনাম না করে পারল না।ঠিক সেই মুহুর্তে পূজা এবং মল্লিকা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।এই অনাকাঙিক্ষত দৃশ্য দেখে ইতোমধ্যে দুজনেই অবাক হয়েছে।কারন এমন ঘটনার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না।পূজা তার রাগ চেপে হাততালি দিতে দিতে ভেতরে প্রবেশ করল।


-- বাহ। অপূর্ব।তুমি যে আজকে সমাজসেবায় নিজেকে ব্যাস্ত রাখবে তা ভাবিনি।
-- পূজা !কি যা তা বলছ।
-- এই ছেলে । তুমি এখানে এসেছ কেন?
-- শালু নিরুত্তর। (মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।)
-- কি হল ? কথা কানে যাচ্ছে না ? উইদাউট পারমিশানে এখানে এসেছ কেন?
-- কা- - - - - -কু- - - - - ।


একটা স্বশব্দ থাপ্পড় মারল পূজা । ক্যাটবেরিটা মাটিতে ছিটকে পড়ল।


-- সে তো বুঝতেই পারছি বেরোও বাড়ি থেকে।( একটা কটাক্ষ হানল সৌতিকের পানে)
-- পূজা ওকে আমি আসতে বলেছি । মারলে কেন ওকে?
-- কি হল এখনও দাঁড়িয়ে আছ।( শালুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল পূজা)


মিলি দৌড়ে শালুকে আটকাতে যাচ্ছিল। মল্লিকা ধরল তাকে।মিলি কাঁদতে লাগল।

পূজা ঘরে এসে রাগে গজগজ করতে লাগল। কোনও কাজই ঠিকঠাক হচ্ছিল না। অবশেষে বলল- - - -


-- কোথাকার একটা রাস্তার ছেলের সাথে তুমি তোমার মেয়ের অবাধে মেশার সুযোগ করে দিচ্ছ। এটা বোঝ না যে, এরা ছুঁচ হয়ে ঢোকে আর ফাল হয়ে বেরোয়?
-- পূজা কারও সম্বন্ধে না জেনে কথা বলাটা আমার পছন্দ নয় সেটা তুমি খুব ভালভাবেই জান।
-- কেন ? ও তো ঠিকই বলেছে জামাইবাবু। তোমার আজকাল কি হল বলতো? কি সব যা তা বলছ?
-- কাবাব মে হাড্ডি( মনে মনে বলল)। আমাদের মাঝে কথা না বললেই খুশি হব মল্লিকা।


মল্লিকা এইরূপ আকস্মিক আঘাতের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না।সে অন্য কোনও কথা না বলে টেলিভিশনে মনোনিবেশ করল।মিলির এই ঝাঁঝালো পরিবেশটা ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না। হে বারবার এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল । কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না।

-- মা , ক্ষিদে পেয়েছে। খাব।
-- তোমার বাবাকে বল। তোমার বাবা রান্না করেনি।(সে আড় চোখে সৌতিক এর দিকে তাকাল)
-- আমি জানি না। আমাকে খেতে দাও।
-- রান্না করবে কি করে? সারাদিনই তো সমাজসেবা চলল।হু- - - - - - - ম। ( একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করল সে)


পূর্বে হয়তো সৌতিক এতটা মানসিক আঘাত পাননিবুকের ভেতর একটা অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে তার।সে ধীর পদক্ষেপে ছাদের দিকে এগোলেন।


সামনের রঙ বেরঙের বাড়িগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সৌতিক বর্মন।এই কয়টা বছরে এতগুলো বাড়ি এখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।অথচ ভাবতেই অবাক লাগে। এতদিন তিনি লক্ষই করেননি।চোখধাঁধানো সব রং।কোনওটার লাল, কোনওটার নীল, কোনওটার সবুজ। ঈষদুষ্ণ হাওয়ার স্পর্শ ভালোই লাগছে তার।মনটা তবুও সেই পুরোনো দৃশ্যে পড়ে আছে।আজ বোধহয় প্রথম নিজেকে খুব অসহায় বোধ করছে সে।কিছু একটা ভুলতে চাইছে কিন্তু ভুলতে তো পারছেই না বরং সেই কথাই গভীর মনযোগ সহকারে ভাবছে , নিজের অজান্তেই।একটা ছোট্ট আওয়াজে সৌতিক চমকে উৎসের দিকে তাকাল।কখন যে মল্লিকা তার পাশে এসে বসেছে তা সে টেরই পায়নি।


-- জামাইবাবু , কি হয়েছে তোমার , বল তো?( অতি আহ্লাদের সহিত বলল সে)
-- নাঃ- - - ।কিছু হয়নি।(একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এল । মনে হল সৌতিক কোনও কারনে হতাশ হয়েছে)
-- তা হলে ছাদে এলে কেন?
-- দেখ মল্লিকা, সব কেনর উত্তর দেওয়া যায় না ।এরকম হাজারো উত্তরহীন কেন অগোচরেই রয়ে যায়।উত্তর খোঁজার চেষ্টা করলেও উত্তর মেলে না।(শেষের কথাগুলো যেন আপনমনে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল সৌতিক)
-- আমি জানি তোমার মন খারাপ।(পরিবেশ লঘু করার জন্য বলল মল্লিকা)
-- জানই যখন জিজ্ঞাসা করছ কেন তাহলে?
-- হুম। চল , খাবে চল।
-- আমার ক্ষিদে নেই । তোমরা খেয়ে নাও।
-- তা বললে হবে ।চল।


অগত্যা যেতেই হল।খাওয়া শেষে মল্লিকার প্রবল অনুরোধে সৌতিক স্বপরিবারে পার্কের উদ্দেশে বেরোল।



-- মা আমরা কোথায় যাচ্ছি?
-- পার্কে।
-- পার্কে। কি মজা । কি মজা।( মিলি আনন্দে লাফাতে লাগল।)




পার্কে এসেও সৌতিকের মন ভাল হল না।মনের ভেতরে বাষ্প আরও ঘনীভূত হচ্ছে।সে শুধুই হুশহাস করছে বাড়ি ফেরার জন্য।বাড়ি ফেরার পথে মিলি বেলুন ওয়ালাকে দেখল রঙ বেরঙের বেলুন হাতে।


-- মনি মা। বেলুন। একটা দাও না। ও মনি মা।


বেলুনওয়ালার কাছ থেকে দশ টাকা দিয়ে একটা বেলুন কিনে দিয়ে মিলিকে কিছুক্ষণের জন্য বাধ্য করা গেল।সূর্য বিদায় জানিয়ে চলে গেছে বহুক্ষণ আগে।ধীরে ধীরে ট্যাক্সিটা মিলিদের বাড়ির সামনে চলে এল ।রঙ বেরঙের বাতিতে শহর সেজ উঠেছে। ওরা এক এক করে গাড়ি থেকে নামল। সৌতিক ট্যাক্সির বিল মেটাল।মিলির কিন্তু সমস্ত চিন্তা ভুলে বেলুন নিয়ে খেলায় মত্ত।হঠাৎ এক ঝটকা হাওয়ায় মিলির হলুদ রঙের বেলুন উড়ে গেল। মিলিও সঙ্গে সঙ্গে বেলুনের পেছনে ধাওয়া করল। দৌড়, দৌড়, দৌড়। হ্যাঁ অবশেষে বেলুনটা মিলি ধরতে পেরেছে। কিন্তু এই শিশুটির ঘোরতর বিপদ শিশুমনে সেই চিন্তা তখনো স্থান পায়নি।


পূজার এতক্ষণে খেয়াল হল যে মিলি তার কাছে নেই। আশে পাশে খুঁজতে লাগল সে।এদিকে ট্রাফিকে সবুজ সংকেত পাওয়া মাত্রই রঙ বেরঙের গাড়িগুলো চলতে শুরু করল। হঠাৎ পূজার চলমান দৃষ্টি বাধাপ্রাপ্ত হল। আঁতকে উঠল সে। মাঝ রাস্তায় বেলুন হাতে মিলি দাঁড়িয়ে।আর একটা গাড়ি সম্পূর্ণ গতি নিয়ে ছুটে আসছে তারই দিকে।যেন গোগ্রাসে গিলতে চাইছে মিলিকে।


-- মিলি- - - - - - ।(পূজা চিৎকার করে উঠল)


সৌতিক এবং মল্লিকা চমকে তাকাল। একটা আর্তনাদ শোনা গেল শুধু। আলো আঁধারিতে স্পষ্ট কিছুই দেখা গেল না। উৎসের দিকে ছুটল তিনজন। নাঃ , মিলির কিছু হয়নি। স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করল তিনজনেই।


কিন্তু পরক্ষণেই খেয়াল হল সৌতিকের।চিৎকারটা তাহলে কার? ছুটল ভিড়ের দিকে। কোনওমতে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গিয়ে যা দেখল তাতে তার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। শালু রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছে।


-- শালু , একি করলি বাবা। ওঠ। এই শালু।


সংকট কালে বরাবরই সৌতিকের মাথাটা ঠান্ডা থাকে।সৌতিক তার মাথাটা শালুর বুকে ছোঁয়াল। হৃৎপিন্ডের ধকধক আওয়াজ এখনও ক্ষীণভাবে শোনা যাচ্ছে।


-- হ্যাঁ। বেঁচে আছে।(মনে মনেই বলল)

পাশেই একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। এইভেবে যে তার ডাক পড়তে পারে। একটা মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যাবে।


-- এই ট্যাক্সি ,হারিআপ।

ধরাধরি করে কোনও মতে শালুকে ট্যাক্সিতে তোলা হল।হসপিটালের সামনে ট্যাক্সি দাড় করিয়ে শালুকে কোলে নিয়েই ছুটলো সৌতিক। এমার্জেন্সিতে শালুকে ঢুকিয়েই বসে পড়ল দরজার সামনে।উত্তেজনায় কাঁপছে সে। গরম বাষ্পে চশমার কাঁচ সাদা হয়ে গেছে। কপাল ফেটে রক্ত বেরোবে বলে মনে হচ্ছে।অতিরিক্ত ঘামছে সে।ভাবনার রাজ্যে সর্বক্ষণ বিচরন করছে সৌতিকের মন। যদি শালু মারা যায়! তবে কি করবে সে?ব্যাক্তিত্বের কাছে কি জবাব দেবে সে? তার জীবন দান করে মারা যাবে শালু? অসম্ভব। নাঃ। এটা হতেই পারে না। কি সব আজেবাজে ভাবছে সে?
পূজা এবং মল্লিকা এসে কোনওমতে একটা বেঞ্চিতে বসাল তাকে।তবুও তার মন মানছে না।বারবারই হাতের ঘড়িটা দেখছে আর এমারজেন্সির দরজার দিকে তাকাচ্ছে। প্রতিটি সেকেন্ড তার কাছে একযুগের সমান মনে হচ্ছে। উদ্বিগ্ন মনে বারবারই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে।দেখতে দেখতে একঘন্টা কেটে গেছে।ঘামে জামাটা ভিজে গেছে সৌতিক বর্মনের। মল্লিকা উপায় অন্ত না দেখে একগ্লাস জল এনে দিল তাকে।


-- জামাইবাবু। জলটা খেয়ে নাও।
-- না , এখন খাব না।
-- প্লিজ । খাও। মাথাটা ঠান্ডা হবে।


সৌতিক কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসটা ধরল। অল্প অল্প করে জল পান করতে লাগল। একটা অজানা আশংকা বারবার তার মনকে পীড়া দিতে লাগল।শালু বাঁচবে তো?


হঠাত্ ডাক্তার এমার্জেন্সি থেকে বেরোলেন।বেরিয়েই জিজ্ঞাসা করলেন------


-- পেশেন্টের গার্জিয়ান কে?
-- আমি।( সৌতিক কিছু বলার আগেই পূজা ধীর স্থির কন্ঠে জবাব দিল)
-- পেশেন্টের অবস্থা খুবই খারাপ। মারাত্মকভাবে মাথায় চোট পেয়েছে। তবে বাঁচার আশা আছে। অপারেশন মাস্ট। সো , বন্ডে একটা সই করতে হবে।নার্স।( একটু জোরে নার্সকে ডাকলেন তিনি)

নার্স বোর্ডে আটকানো একটা কাগজ নিয়ে হাজির হলেন।

-- পেশেন্টের নাম?
-- শালু।
-- পেশেন্টের সঙ্গে আপনার কি সম্পর্ক?


পূজা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল----

-- আমি ওর মা।

তৎক্ষনাৎ সৌতিকের কাঁপা কাঁপা হাত থেকে কাঁচের গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আর তার দুই চোখে নামল অশ্রুর ধারা।




Post a Comment

0 Comments