ললিপপ গ্রহ- short bengali story

কল্পবিজ্ঞান



বৃদ্ধ সৌগত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন বিশ্ব-বিখ্যাত বিজ্ঞানী । তাকে বিগত বছরে তেমন কেউ দেখেনি । তাঁর প্রীয় ছাত্র সুবীরের প্রত্যহ যাতায়াত ছিল তাঁর বাড়িতে । কি করতে যে সে যায় , তা কেউ জানত না । শহরের প্রান্তে সৌগতর এই বাড়িটি বলা যায় সুনসান । সৌগত তার কাজের সুবিধার্থে শহরের প্রান্তে নির্জনে বাড়ি করেছেন। 

ধীরে ধীরে সুবীরের সৌগতর বাড়ি আসা যাওয়ার মধ্যেকার ব্যবধান বাড়তে লাগল। কিন্তু আশ্চর্য অথচ দূঃখের ঘটনা ঘটল এক ঝকঝকে রৌদ্রজ্জ্বল সকালে ।সৌগতর বাড়ির চারপাশে পুলিশ আর সাধারণ জনতার ঢলে তাঁর বাড়ির সহজাত সুনসান পরিবেশের ছন্দপতন ঘটেছে।

বৃদ্ধ সৌগতর মৃতদেহটা সসম্মানে পুলিশ গাড়িতে তুলল । সুবীরকে জোর করে গাড়িতে তুললেও তাকে ঠিক প্রকৃতিস্থ মনে হল না‌‌।কি এমন ঘটল যে গুরু শিষ্যের এমন অবস্থা হল!

সৌগত আর সুবীর দুজনেই ২২২২ সাল থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এর নতুন যন্ত্র আবিষ্কার করছে। কঠোর পরিশ্রমের পর সফলতা লাভ করেছে ওরা। যন্ত্রটার নাম দিয়েছে যুমোস্কোপ। সৌগত বললেন- 
- সুবীর , আজ অমাবস্যা। সব গ্রহ নক্ষত্র পরিষ্কার দেখা যাবে।
- স্যার, তাহলে ললিপপ কে নিশ্চয়ই আরো সুন্দর দেখাবে।
- হ্যাঁ , তা তো বটেই। তবে , শুধু ললিপপ কে সুন্দর দেখালে চলবে না , সেখানে পাড়িও জমাতে হবে শিগগিরই। 

সুবীরের এই ব্যাপারটা একটু অবিশ্বাস্য লাগল । ১২০০ আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে ললিপপ, ঐগ্রহে যাওয়া কি চাট্টিখানি কথা! সুবীর জিজ্ঞাসা করেই ফেলল , 
-কিন্তু কিভাবে সম্ভব? সে তো অনেক দূরে।

সৌগত যুমোস্কোপটা পরিষ্কার করতে করতে বললেন , 
-সম্ভব  , সুবীর সম্ভব। এখনো আমাদের অনেক কাজ বাকি।একটা নভোযান তৈরি করতে হবে। কিন্তু এটা তুমি কাউকে বলো না , বুঝলে। এমনিই লোকের হাসির পাত্র আমরা । তারপর আবার আছে সরকার , আসলে আমি চাই না সরকার এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করুক।নাও চারিদিকে অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে।যুমোস্কোপটা লাগাও দেখি। সুবীর নভোযান তৈরির স্বপ্নে বিভোর হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ সৌগতর আদেশ তার কানে ঢুকল । সে ধড়ফড় করে উঠে যুমোস্কোপটা ঠিক করতে লাগল। সৌগত ল্যাপটপ এ দেখতে থাকলেন আর নির্দেশ দিতে থাকলেন সুবীরকে। সুবীর তাঁর নির্দেশ যথাযথ ভাবে পালন করতে লাগল । কঠোর পরিশ্রম আর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ এর পর সৌগত উৎসাহিত হয়ে বললেন ,
-সুবীর, সুবীর , আমরা যা অনুমান করেছিলাম , ঠিক তাই। একটু বাঁদিকে সরাও তো। 
পুনরায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ এর পর সৌগত আরো উৎফুল্ল হয়ে বললেন, 
-ইউরেকা , ইউরেকা!
 সুবীর বিষ্ময়ে বলল, কি স্যার?
সৌগত ল্যাপটপটা সুবীরের দিকে ঘুরিয়ে বললেন, নাও দেখ।
ল্যাপটপের পর্দায় ললিপপ কে দেখে সুবীরের অবিশ্বাস্য লাগছিল ‌। সৌগত নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন , কি দেখছ সুবীর?
সুবীর খুব মনোযোগ সহকারে ললিপপ কে দেখছিল। সে আস্তে আস্তে বলল , স্যার নীলের মধ্যে সবুজের ছোপ। 
সৌগত বললেন , তাহলে কি বুঝলে?
সুবীর তেমনিভাবে ই বলতে লাগল , নীলরংকে যদি জল অনুমান করি তবে সবুজ তো গাছের অস্তিত্বের কথা বলছে। সৌগত খুশি হয়ে বললেন , একদম ঠিক বলেছ । তুমিই আমার যোগ্য ছাত্র। হা হা হা। 
হাসিটা প্রশমিত করে আবার বললেন , তবে এগুলো সবই অনুমান মাত্র । ওখানে অন্য কিছুও থাকতে পারে । যাইহোক আজ ভালো করে দেখে নাও কাল থেকে নভোযান তৈরির কাজ শুরু করতে হবে। কিছুদিন নভোযান তৈরির কয়েকটি বই পড়তে থাক। ততদিন আমী যন্ত্রপাতি যোগাড় করি। এটা কিন্তু খুব সময়সাপেক্ষ , আর ব্যায়বহুল। অর্থ নিয়ে ভেব না তুমি সময়টা নিয়ে ভাব । সৌগত বেরিয়ে গেলেন।

যদিও এই ত্রয়োবিংশ শতাব্দীতে নভোযান তৈরি করাটা কোন ব্যাপারই নয়। তবুও যেহেতু এই নভোযান নিয়ে পাড়ি দিতে হবে ১২০০ আলোকবর্ষ দূরে, তাই অনেক নিখুঁত ভাবে তৈরি না করলে পরে সমস্যা হতে পারে , আবার সৌগতর নতুন কিছু সংযোজন থাকায় বহু দিনের কঠোর পরিশ্রমের পর ওরা নভোযানের একটা নতুন কাঠামো দিতে পেরেছিল।আজ ক্লান্ত এবং পরিশ্রান্ত সৌগত সুবীর কে বললেন , সুবীর , ব্লু এম্পিটারটা দাও তো। সুবীর এম্পিয়ারটা দিতে দিতে বলল, স্যার এটা দিয়ে কি হবে ? সৌগত বললেন- হুম, এটাই তো নভোযানের নতুন সংযোজন। নভোযানের ৫০০ কিলোমিটার এর মধ্যে কোন বিপদ থাকলে সতর্ক করবে । এমনকি নভোযানের কোন অংশে বিপদ ঘটে গেলে নভোযান সেই অংশ সহজেই ত্যাগ করে আমাদের জীবন রক্ষা করবে । এবার ব্যালেন্স রিবটা ঐখানে বসাও । 
সুবীর নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করল। সৌগত তার হাতের কাজ করতে করতে বললেন , মনে হচ্ছে আর দুদিন সময় দিলে , নভোযান দাড়িয়ে যাবে। তারপর ললিপপের হাতছানিতে সাড়া দেওয়াই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

নভোযান এখন তৈরি । ওরা এর নাম দিয়েছে ল্যাকিও। সৌগতর বড় বাড়ির ছাদেএটাকে বসানো হয়েছে । এটা দাঁড়িয়ে আছে যাত্রী এবং চালকের অপেক্ষায়।
এখন নিশুতি রাত। সৌগত এবং সুবীর ছাদে এসে দাঁড়ালো।সৌগতর নির্দেশে সুবীর ল্যাকিওর দরজা খোলার সবুজ সুইচ চাপল। খুলে গেল ল্যাকিওর দরজা। ভেতরের  আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগলো বাইরে। ওরা দুজন ল্যাকিওর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।দরজা বন্ধ করল। সৌগত তাঁর নিজের নির্ধারিত চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, বিদায় পৃথিবী। সুবীর তার চেয়ারে বসল, সৌগতর গলাটা আজ তার কাছে অপরিচিত মনে হল । এ যেন তার পরিচিত স্যার নয় । এ অন্য কেউ। সুবীর হেডফোনটা কানে লাগাও, বললেন সৌগত। সুবীর কানে হেডফোন লাগাতে লাগাতে ভাবল , স্যারের স্বর যেন কেমন কান্না ভেজা। সে তার স্যারের মুখের দিকে তাকাল, দেখল স্যার রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে। ল্যাকিও আকাশে উড়ল।

সামনের মনিটরে সব দেখা যাচ্ছে । হ্যাঁ ঐ যে মঙ্গল। পৃথিবীতো এখন একটা নীল বিন্দু। ল্যাকিও মঙ্গলের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। এভাবে ধীরে ধীরে পৃথিবীর সৌরজগত ত্যাগ করল ল্যাকিও। সৌগত বললেন- 
-সুবীর কোন সিগনাল পাচ্ছ কি? 
-না স্যার।
-সিগনাল পেতে পার।
সুবীর বসে রইল অপেক্ষায়।ক্লান্তিতে একসময় ঘুমে তার চোখ কিছুটা আচ্ছন্ন হয়ে আসে।তার আসনটা সৌগত র আসন থেকে একটু পেছনে সুতরাং তিনি কিছুই টের পেলেন না। তিনি ল্যাকিও চালাতে লাগলেন ধৈর্যের সঙ্গে।

কিচিরমিচির শব্দে সুবীরের আচ্ছন্নতা কাটল।তার মনে হল এখানে পাখির ডাক কোথা থেকে এল । হ্যাঁ স্যার তো তাকে দ্বায়িত্ব দিয়েছিল। ও ভালো করে শুনল। কিন্তু কিচিরমিচির শব্দ সিগন্যাল পাঠাচ্ছে কারা?

হতভম্ব সুবীর স্যারকে ডাকলো। সৌগত এলেন মন দিয়ে শুনলেন সেই সিগনাল । বললেন , হুম তুমি একটা সিগন্যাল পাঠাও। ……. কথা শেষ হওয়ার আগেই বিপদ সংকেত বেজে উঠল। মনিটরে দেখা গেল একটা গোল চাকতি ওদের দিকে ছুটে আসছে। চাকতির মধ্যেটা লাল রক্তবর্ণ। চাকতির পাশ থেকে বেরিয়ে আছে করাতের দাঁতের মত অজস্র দাঁত। বুকের টিপটিপানি বেড়ে গেল। হাতে মাত্র ৫ সেকেন্ড। এই পাঁচ সেকেন্ডে ল্যাকিওর দিক পরিবর্তন না করলে বিপদ অবশ্যম্ভাবী। সৌগত এক্সিলেটর চেপে ল্যাকিওর স্পিড বাড়িয়ে দিলেন। দিক পরিবর্তন করলেন মুহূর্তে র মধ্যে , গোল চাকতিটি হুস করে ল্যাকিওর গাঁ ঘেঁসে বেরিয়ে গেল। সুবীর অস্থীরভাবে জিজ্ঞাসা করল, স্যার এটা কি?

-এটা এলিয়েনদের নভোযান। আমরা ওদের সৌরজগতে ঢুকে পড়েছি।ওটা বোধহয় ওদেরই সিগনাল ছিল। অথবা অন্য কারও ও হতে পারে , যারা মানুষের ভালো চায়। কিছুই বলা যায় না সুবীর। এ এক মস্ত গোলকধাঁধা, যতক্ষণ না তুমি ডিকোড করছ , ততক্ষন কোন কিছুই বলা যায় না, সম্ভব অসম্ভব এর গোলমেলে হিসেবেই শুধু আটকে যাবে ।

-স্যার! এখন উপায়?(উৎকন্ঠিত সুবীর )
সৌগত স্ক্রিনের থেকে চোখ ফিরিয়ে কথা বলছিলেন । সুবীরের উৎকন্ঠায় স্ক্রিনে চোখ ফেরালেন। ভয় আর বিষ্ময়ে সেও যেন থ হয়ে গেলেন। এতগুলো গোল চাকতি যেন শিকারের জন্য ই ওৎ পেতে ছিল।
-সুবীর , তুমি এক্সিলেটরের স্পিড ফুল কর । শিগগিরই।
দুজনেই ঘাবড়ে গেছে । সুবীর যন্তচালিতের মত নির্দেশ পালন করল তৎক্ষণাৎ। সৌগতও স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিক পরিবর্তন করতে লাগলেন নির্ভুলভাবে। হৃদপিণ্ডের ধরাসধরাস  শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। চাকতি গুলো যেন বৃষ্টির ফোঁটার মত আছড়ে পড়তে চাইছে ল্যাকিওর ওপর। শেষ রক্ষা কি হবে না ওদের? সৌগতর অপরিসীম ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রমে বিপদ মুক্ত হল অবশেষে। আর ভয় নেই। তবুও বলা যায় না । এটা মহাকাশ । সম্পূর্ণ অপরিচিত পথ। পদে পদে বিপদ । আর এটাই স্বাভাবিক। সব সময় সতর্ক থাকতে হবে।

অনেকক্ষণ পর সুবীর এক অদ্ভুত প্রশ্ন করল । 
-স্যার আমরা কি পৃথিবীতে ফিরে যাচ্ছি?
- মানে?( ধমকের সুরে)
-স্যার মনিটরের ঐ নীল গ্রহটা তো পৃথিবী বলেই মনে হচ্ছে।
-হা হা হা। ওটা মোটেও পৃথিবী নয় , ভৌগলিক দিক বিবেচনা কর , দেখবে বুঝতে পারবে। পৃথিবীর ম্যাপের সঙ্গে কোনো অংশেই এর মিল নেই। দেখ একপাশে জলে ভর্তি অন্য পাশে স্থল। স্থল আর জলের সংযোগস্থলটা একটা রিং সৃষ্টি করেছে। 
- ল লি প   প!(অজান্তেই বলে ফেলল সুবীর)
সৌগত ম্লান হাসল। ধীরে ধীরে ললিপপ আরও কাছে এগিয়ে এল। 
-একটা সিগনাল পাঠাও তো!
সুবীর অবাক চোখে তাকালো। হেডফোন কানে গুঁজে কি যেন শুনল , তারপর একটা সিগন্যাল পাঠালো। 
-স্যার কোনও সিগনাল ই পাওয়া যাচ্ছে না।
-বল কি! এত সুন্দর গ্রহ , যেখানে জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান আছে বলেই মনে হচ্ছে। অথচ সিগনাল ……...। শেষের কথাগুলো সৌগত বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল।

ল্যাকিও এখন ললিপপের সুবিশাল সমুদ্রের ওপর স্থলের ওপর ঘুরছে। একটু পরেই দেখা মিলল সবুজের। সমুদ্রতটে ল্যাকিও ল্যান্ড করালেন সৌগত। সুবীর তক্ষুনি নামতে যাচ্ছিল। সৌগত বাঁধা দিলেন ,
- একি করছ? নিজের প্রানটা ক্ষোয়াবে নাকি ? বাইরেটা দেখে ভেতরটা অনুমান করা যায় , সত্যটা জানা যায় না। নাও এই বিশেষ শার্টপ্যান্টটা পর । এই পিস্তলটা রাখ। অক্সিজেন সিলিন্ডার এখানে কোন কাজে লাগবে না । এখানে বাতাসে যথেষ্ট অক্সিজেন আছে। বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ ও খুবই কম। 
সুবীর ল্যাকিওর দরজা খুলল।তার হাতে একটা ছোট ক্যামেরা। যাতে এই সমস্ত কার্যক্রম রেকর্ড করেছে। সৌগতর ল্যাকিওর মাটিতে প্রথম পা রাখার মুহুর্ত টাও ক্যামেরাবন্দি করবে। সৌগত নামলেন, প্রথম মানুষের পদস্পর্শ পেল ললিপপ।

বাতাসে বেশ একটা মিষ্টি গন্ধ। মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। সৌগত বললেন 
-শরীরটা আজ বেশ চাঙ্গা লাগছে।
-আমারও কোনো ক্লান্তি বোধ হচ্ছে না।
-উত্তেজনা , বুঝলে। তার উপর এই স্বর্গীয় আবহাওয়া। আহা!
সুবীর হাসল একটুখানি।
-আমাদের এখান থেকে সবই সংগ্রহ করতে হবে। 
-স্যার পাখিগুলো তো চিনতে পারছি , কিন্তু….।
-ওগুলো অন্য প্রজাতির গাছ। হয়তো‌ এরকম গাছ পৃথিবীতে ও ছিল বহুকাল আগে । বা হয়তো বহুকাল পরে এরকম গাছ জন্মাবে পৃথিবীতে। সে যাই হোক , ওগুলো আমরাই নামকরন করব। 
সৌগতর কথার মাঝেই সুবীর গাছ থেকে একটা সুপরিপক্ক সুন্দর ফল ছিড়ল । মুখে পুরতে যাচ্ছিল। সৌগত ধমকে উঠলেন। 
-তোমায় কতবার বলেছি এটা পৃথিবী নয়। এটা ললিপপ। এখানকার সবই আমাদের অজানা। এই যে ফলটা তুমি ধরে আছো এটা তো বিষাক্ত ও হতে পারে। এদিকে দাও।
সুবীর হতবুদ্ধির মত মত দাঁড়িয়ে ছিল, এবার ফলটা তার স্যারের হাতে দিল। সৌগত তার পকেট থেকে একটা যন্ত্র বার করল তার মাথাটায় একটা সরু সুচ । ওটা ফলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। আস্তে আস্তে বললেন,
-হুম, না , এটা বিষাক্ত নয় । তুমি এটা খেতে পার।
সৌগত ও আস্বাদন করলেন । বললেন , অপূর্ব!


ওরা দুজনে জঙ্গলের আরও গভীরে প্রবেশ করল। হঠাৎ একটা কিম্ভুতকিমাকার জন্তু প্রচন্ড গর্জন করতে করতে সামনে এল। সুবীরের পিস্তলটা বের করার আগেই সৌগতর পিস্তলের ইলেকট্রিক রশ্মিতে মারা পড়ল জন্তুটা। সুবীর ভয়ে আর বিষ্ময়ে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল, স্যার দেখেছেন?
সৌগত জন্তুটা র দিকে তাকিয়েই বললেন , হ্যাঁ , তিনপেয়ে জন্তুটা আমিও প্রথম দেখছি।তবে জানো তো সুবীর , ললিপপের জীবন রহস্য তো আমরা কিছুই জানি না , কত অবাক করা মুহুর্ত অপেক্ষা করে আছে কে জানে। চল এগোই।

একটুখানি এগিয়েই সুবীর দাঁড়িয়ে এদিকে ওদিকে তাকাতে লাগল , কান পেতে শুনতে চাইল কিছু। 
-স্যার মনে হচ্ছে ঐ দিকে নদী আছে। (পশ্চিম দিকে নির্দেশ করল)
-চল তাহলে , ওদিকটায় যাই। 
নদীর তীরে পৌঁছানোর আগেই ঝপাং করে একটা শব্দ হল ।সৌগত ভালো করে দেখে নিয়ে বললেন,
-সুবীর , এভাবে আর এগোন ঠিক হবে না। চল , ল্যাকিওতে ফিরে চল। আগে ললিপপটা ভালো করে চক্কর দিয়ে দেখতে হবে কোন জনপদ আছে কিনা।

ওরা ল্যাকিও তে ফিরে আবার যাত্রা শুরু করল। ললিপপ এর জঙ্গলের উপর দিয়ে ল্যাকিও যাচ্ছে। সুবীর বলল 
-স্যার শুধুই তো জঙ্গল, জনপদ আছে বলে তো মনে হয় না ।
-হুম , তাই তো দেখছি। কিন্তু জীবনের অস্তিত্ব যখন আছে তখন উন্নত মস্তিষ্কের জীব থাকা অসম্ভব নয় । তাও তো দেখছি না। 
এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ওরা ল্যাকিওর অন্ধকার দিকে চলে এসেছে। আকাশে তিনটে বড় মাপের উপগ্রহের আলো, ললিপপ কে রাতেও ইষদ্ উজ্জ্বল রাখছে। দেখার কিছুই নেই। চারিদিকে সমুদ্র আর সমুদ্র। আলোতে ফেরা দরকার।

অন্য একটা জায়গায় ল্যাকিও রাখলেন সৌগত। আবার জঙ্গলের রাস্তায় চলল তারা। এখানে জঙ্গলটা খুব গাড় । গাছগুলো বেশ এঁটে এটে আশে। বড্ড পাশাপাশি। যেন কোন রত্নভান্ডারের প্রহরী। অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে সুবীরের ওপরে চোখ পড়ল। ভয়ে আর বিষ্ময়ে চিৎকার করে উঠল ।

-আ -হ -হ স্যার, ঐ …..।
 সৌগত তাকিয়ে হতবাক। একচোখা হলুদাভ  জন্তুটার ছটা পা না হাত বোঝা যাচ্ছে না।ও যেন ভষ্ম করবে ওদের মুখ থেকে সবুজ লাভা গড়িয়ে পড়ছে । ওদের দিকে লাফ দেওয়া মাত্রই সৌগত সুবীর এর পিস্তল একই সঙ্গে গর্জে উঠল। জন্তুটা মাটিতে পড়বার আগেই বিকট একটা শব্দ করল । সেই হতাশা আর আক্রমনাত্মক শব্দে সুবীর আর সৌগতর পিলে চমকে উঠল। পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত জঙ্গল একেবারে নিস্তব্ধত হয়ে গেল। সৌগত সুবীর দুজনেই দুজনের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। ঠিক কিছুক্ষণ পরেই জঙ্গলে যেন ঝড় উঠল ।ওরা দৌড়ে একটা পাথরের আড়ালে চলে গেল । অনেক টা গুহার মত ।ওরা দেখল ঐ প্রজাতির অনেক জন্তু এদিকে ওদিকে কি খুঁজতে লাগল। হঠাৎ সব হুড়মুড় করে মৃতদেহটা র উপর ঝুঁকে পড়ল‌ । তারপর মৃতদেহটা নিয়ে পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল। চারিদিকে আবার নিস্তব্ধ। সৌগত বাইরে বেরোতে যাবেন , এমন সময় আবার মড়মড় শব্দে ভরে গেল চারিদিকে । আবার গুহায় প্রবেশ করলেন। দুজনেই অবাক ! সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দশপেয়ে চারচোখা বেগুনী রঙের এক জন্তু। হঠাৎ সেই তীব্র চিৎকার আর শুরু হল যুদ্ধ । বোধহয় দুই প্রজাতির মধ্যে মৃতদেহটা নিয়েই চলছে এই যুদ্ধ। যুদ্ধে কেউ কারো কম যায় না । ধারালো নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে ওদের শরীর। ভাগ্যিস ওরা ঐ গুহার মধ্যে ছিল ,না হলে হয়তো উভয় প্রজাতির প্রধান শিকার হতে হতো ওদের ‌। 


যুদ্ধ থামলে ওরা ল্যাকিওর উদ্যেশ্যে রওনা দিল। এদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে দ্রুত । এই অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে পথ ঠিক রাখা সত্যিই অসাধ্য। সৌগত , ইনি অনেক অভিজ্ঞতার সাক্ষী, একসময় বিমান চালনা করার ট্রেনিং যেমন নিয়েছেন, অন্য দিকে আবার পাহাড় পর্বত , জঙ্গল ঘোরার নেশাও ছিলো। অবশেষে ওরা অনেক পরিশ্রমের পর ল্যাকিওর কাছে পৌছল। সুবীর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বলল, 
-স্যার ল্যাকিও কাঁপছে না! 
সৌগত আইপ্যাডে কি যেন করছিলেন। সুবীরের কথায় আমল দিলেন না । সুবীর আবার জানলার দিকে নির্দেশ করে বলল ,
-স্যার ঐ পাহাড়টায় এত আলো এল কোথা থেকে?
এবার সৌগত সহজাত কারনেই চোখ ফেরালেন। বললেন ,
-দুটো একটা ফুলকিও দেখছি ছিটকে পড়ছে । ইয়েস , আগ্নেয়গিরি! 
হঠাৎ বিদ্যুতের প্রচন্ড গর্জনে কানে তালা লাগার উপক্রম হল।বাইরে ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে।বিপদ সংকেত বেজে উঠল ল্যাকিওতে। ওরা দুজনে ই হতভম্বের মত মনিটরের দিকে তাকালো। একটা আগুনের মত কিছু ল্যাকিও র দিকে এগিয়ে আসছে। বিপদ ঠেকানোর জন্য হাতে মাত্র আট সেকেন্ড সময় আছে ।

সুদক্ষ সৌগত তার কাজে অবহেলা করল না । নভোযান চালু হতেই … না বিপদ ঠেকানো গেল নাৎ। ল্যাকিওর তলদেশে ললিপপের একটা দুর্বল ফাটল দিয়ে লাভা বেরিয়ে ব্যাকপার্টে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। মনিটরের সেই গুরুত্বপূর্ণ সিগনাল দেখল সুবীর। সে তার কথা স্যার কে বললেও সৌগত কোন গুরুত্ব দেননি এতে।কারন এমনিতেই তীনি অনেক টেনশনে ভুগছিলেন। ল্যাকিও এখন মহাশূন্যে। সে তার সহজাত কারনেই তার আগুন লাগা ব্যাকপার্ট ছেড়ে দিয়েছে । ললিপপের বুকে তার অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই সবটা পুড়ে এতক্ষণে ছাই হয়ে গেছে। আগুন থেকে ল্যাকিও এখন নিরাপদ। সৌগত বললেন-
 -আর ভয় নেই । আমাদের ল্যাকিও এখন মেঘরাশির অনেক উপরে । 
সুবীর ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

এভাবেই কাটল আরো ২৮ ঘন্টা । ধীরে ধীরে ললিপপের জমাট অন্ধকার কেটে গেল। ঝড় বৃষ্টি অগ্নুৎপাত তখনও সমান তালে চলছে । ললিপপ এর সাগর তো তখনও উত্তাল। সৌগত চিন্তান্বিত হয়ে বললেন 
-জ্বালানী আর খাবার দুটোই শেষ হয়ে আসছে। আমাদের ফিরতে হবে।এই ঝড়বৃষ্টি কতদিনে শেষ হবে কে জানে। 
সুবীর একদৃষ্টিতে চেয়েছিল ললিপপের দিকে। 
-ললিপপের এই পরিবর্তন দেখার ইচ্ছে আমারও হচ্ছে সুবীর। কিন্তু ..। আমরা যখন আবার আসব তখন ললিপপের ম্যাপে হয়তে আরো পরিবর্তন ঘটবে । চলো ফেরা যাক।

ললিপপের এই পরিবর্তন দেখার ইচ্ছে থাকলেও ওরা বাধ্য হয়েই পৃথিবীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। ল্যাকিও নিরাপদেই অবতরণ করল পৃথিবীতে। সৌগত বিজয়ের গর্বে উৎফুল্ল মনে বললেন,
-সুবীর আমরা দুজন পৃথিবীর এমন দুটি লোক যারা ১২০০ আলোকবর্ষ দূরের কোনো গ্রহে ভ্রমণ করে ফিরল। চল ওদের তাক লাগিয়ে দিই। জুরোকিটটা ব্যাকপার্ট থেকে খুলে আনো তো দেখি।

সুবীর ব্যাকপার্টের দরজা খুলল । কিন্তু একি ! সুবীর চিৎকার করে উঠল। সৌগত এসে দেখলেন ল্যাকিও সংলগ্ন তার সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকপার্ট নেই । সেখানেই ছিল জুরোকিট। যাছাড়া হার্ডকপি গুলো অচল । এটা সৌগতর অন্য একটা আবিষ্কার। তথ্য চুরির ভয়েই এই নতূন আবিষ্কার করে সে। কিন্তু এটা ঐ একটাই ছিল। আর নতুন বানাতে গেলেও অনেকদিনের ব্যাপার। সেও চাট্টিখানি কথা নয়। তাছাড়া সৌগত র সেই বয়স আর মনের জোর ও নেই। সুবীরের মনে পড়ে গেল সেই সিগনাল এর কথা। সৌগত তখন কোনও আমলই দেননি। এদিকে উত্তেজনায় সৌগত র সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল । সুবীর সৌগতকে ল্যাকিও থেকে নামিয়ে চেয়ারে নিয়ে বসালো । সৌগত কাঁপাকাঁপা স্বরে বললেন,
-আমার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার এভাবে ধ্বংস হয়ে গেল। সব শেষ।
চিরিদিকে নিস্তব্ধ। কিছুক্ষণ পর সুবীর সৌগত র দিকে তাকালো। দেখলো সৌগত তার দিকে তাকিয়ে আছে। সুবীর মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে সৌগতর দেহটা নাড়া দিল। সেটা কাত হয়ে পড়ল একদিকে। সুবীর পিছিয়ে এল দুপা। স্যারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল ,
-স্যার ললিপপ …..।
একটা বিকৃত চিৎকার করে দুহাতে মুখ ঢাকলো সে। সেই মুহূর্তে বৃদ্ধ হাউসকিপার বাদলদা উপরে এসে বলল, 
-আপনারা কোথায় গেছিলেন? স্যারের কি হল?
সৌগতকে ধরতে যাচ্ছিল বাদলদা।
সুবীর ধমক দিয়ে বলল,
-ছোঁবে না স্যার কে। স্যা-র-কে ছোঁবে না। যাও এখান থেকে । গেট আউট। স্যার এখন ললিপপে। ললিপপ ছাড়া স্যার থাকতে পারবে না।

সুবীরের রক্তবর্ণ চোখ আর আবোল তাবোল কথা শুনে বৃদ্ধ বাদলদা ভ্রু কুঞ্চিত করে সংশয় জড়িত কন্ঠে বিড়বিড় করে বলল,
-পাগল হয়ে গেল নাকি!!

Post a Comment

0 Comments