স্মৃতির পালক

নারকেল গাছ
     
               (১)
 দক্ষিণা হাওয়াতে নারকেল গাছের কচি পাতার সংঘর্ষে এক অদ্ভুত অজানা শব্দ মনে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। হেমন্তের সাদা মেঘ যেন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে চলেছে এক অজানার পথে। টালিগঞ্জের টলি পাড়ার ছাদে বসে সকালের মিষ্টি রোদে আরতি  এই অপরূপা প্রকৃতির রূপ দর্শন করছে।আহ,যেন দৃষ্টি জুড়িয়ে যায়।

 কিন্তু রূপের এই সূক্ষ্মতা দেখার মানসিকতা বোধহয় আরতির ছিল না। কিছুটা আনমনেই টেবিলের উপর মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। এমন সুন্দর আকাশ এমন সুন্দর পরিবেশেও বোধহয় আরতিকে বেমানানই লাগছিল। 
কিন্তু কেন বেমানান লাগছিল?
কি ঘটেছে আরতির জীবনে? 
না পূর্বে তো কিছুই ঘটেনি। তাহলে আরতি এতটা আনমনে বসে ঠিক কি ভাবছে। 

                   (২)
কাল শুভ নামের একটা ছেলে হঠাত্ রাস্তায় প্রোপজ করেছিল আরতিকে। সেই কথাই ভাবছিল, একলা নির্জনে। কিন্তু আর কতক্ষন,  আর বসলে যে অফিসে দেরি হবে। 
তাই আরতি তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নিয়ে বাবা মাকে দ্রুত বাই বলে বেরিয়ে পড়ল।
যতই সে অন্য কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চাইছে ততই যেন বারবার সেই ছেলেটির কথাই মনের পর্দায় ভেসে চলেছে। একটা আলতো চাটি দিল মাথায়। আসলে ছেলেটিকে তার ভালোই লেগেছে। গোলগোল চোখ,লম্বা নাক। লজ্জা আর অদ্ভুত ভাললাগায় আরতির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি যেন আপনিই ফুটে উঠল।মনেমনে ঠিক করল, আজকে বললে হ্যাঁ বলবে। 

ধীরে ধীরে বাসস্টপে এসে দাঁড়াল। চারিদিকে দেখল একবার। না আজ সে আসে নি। কাল এখানেই দেখা হয়েছিল। ঠিক এই সময়েই। কিছুটা হতাশ হল সে। আজও কি আসবে ?নাকি ! না একি ভাবছে সে। তার ভালোবাসা মোটেও ওরকম না। কি হল! ভা ল বা সা। তবে কি সত্যিই! লজ্জায় মুখ ঢাকল। 

এসব ভাবতে ভাবতেই বাস চলে এল। কিন্তু উঠল না আরতি। এভাবে দুটো বাস মিস করল সে । কিন্তু এখনো এল না শুভ।
না আর অপেক্ষা নয়। এবার গন্তব্যের উদ্দেশে পাড়ি দিতেই হবে। বাস এসে দাড়াল। ধীর পদক্ষেপে বাসে উঠতে গিয়েও একবার পেছনে তাকিয়ে দেখে নিল আরতি। না সে নেই এই জনমানুষের ভীড়ে। কি সব ভাবছে সে। এসব এখন হয়েই থাকে আকছার। হয়তো ছেলেটি প্রাংক ভিডিও করছিল।  

বাসে উঠল। বাস ছুটে চলল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আনমনে বাসের জানলায় কপাল ঠেকিয়ে তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে।

                   (৩)
প্রেম বলে সত্যিই কিছু নেই। আনমনে ভাবতে লাগল। কিন্তু কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে বোধহয় । ছেলেটির চোখমুখে মিথ্যের ইঙ্গিত ছিল না। আরতি সাইকোলজিক্যাল অনেক বই পড়েছে। ওর হাত শান্ত ছিল। চোখে ছিল আশার ছাপ স্পষ্ট। 
 আরতি একটু ছেড়ে আসা পথটা দেখার চেষ্টা করল। স্পষ্ট কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মনে হয় কেউ যেন দৌড়ে বাসে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ঐ ছেলেটা নয় তো। ধ্যাত কি সব আবোলতাবোল চিন্তা । আরতির মাথাটাই নষ্ট হয়েছে।

পরক্ষনেই পেছনে সমবেত চিৎকার শুনে পেছনে তাকাল। আরে এ তো ঐ ছেলেটা ই দৌড়াচ্ছে। মুখে একটু হাসি ফুটল কিন্তু পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল ।একটা লরি সমান গতিতে এগিয়ে এসে শুভকে পিষে দিয়ে ডানদিকের রাস্তায় মোড় নিয়ে উধাও।একটা চিৎকারও করতে পারল না আরতি। ভয়ে বিষ্ময়ে নিথর হয়ে গেল। 

আজও এক রৌদ্রজ্বল সকাল। আজও আরতি একই জায়গায় বসে আছে। সেই বাসস্ট্যান্ড, শুধু পার্থক্য একটাই, কাল যে ছিল স্বপ্ন আজ সে স্মৃতি। 
 

Post a Comment

0 Comments