অনুরাগের ছোঁয়া


প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেল আদির। বাস্তবে ফিরতে মিনিট খানেক সময় লাগল তার।ট্রেন তার সর্বোচ্চ গতি নিয়ে গন্তব্যে ছুটে চলেছে। আদি যখন ঘুমিয়েছিল তখনও তাঁর সঙ্গী অনুপস্থিত ছিল । তাই গতরাত্রে একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়েছিল সে। কিন্তু ঘুম ভেঙ্গেই ঠোক্কর খেল আদি। একটা সুন্দরী মেয়ে তার কামরায়। অবিশ্বাস্য। নিজের হাতেই একটা চিমটি কাটল সে।চিমটিটা এত জোরে কেঁটেছিল যে ব্যাথায় জোরে চেঁচিয়ে উঠল।মেয়েটা মিষ্টি স্বরে বলল
-- কি হল?
কোনওমতে একটা উত্তর দিয়ে বাথরুমে ঢুকল আদি। সে তো এটা কল্পনাও করেনি যে তারই সহযাত্রী একটা মেয়ে!এখন কি করবে সে? না,স্বাভাবিক হতে হবে তাকে। এখনো 4 ঘন্টা কাটাতে হবে এই অনাকাঙিক্ষত সহযাত্রীর সঙ্গে।

আদি স্বভাবতই লাজুক স্বভাবের। আর মেয়েদের এত মাত্রায় শ্রদ্ধা করে যে এখনো গার্লেফ্রন্ড জোটেনি। না জোটেনি বললে ভুল হবে । সেই দূঃসাহসও একবার দেখিয়েছিল আদি।তার স্কুল লাইফ এ।

আরাধ্যা। আদির মনের রাজকুমারী। প্রোপোজও করেছিল ফিল্মি স্টাইলে। কিন্তু ওদের দুজনের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাড়াল ইগো। শুরুর আগেই শেষ। প্রেম তো দূরে থাক ।আরাধ্যা আদির দেওয়া সেদিনের প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিল। এবং সেই সঙ্গে ভালোই গন্ডগোল পাকিয়েছিল । অবশ্য আদি বরাবরই নির্ভীক সাহসী আর খামখেয়ালি প্রকৃতির ছেলে ছিল,আর এটা সবাই জানত,তাই রক্ষে। পুরো ব্যাপারটা একাই সামলে নিয়েছিল সে।

আজ এই সন্ধিক্ষণে আরাধ্যাকে প্রবল ভাবে মনে পড়তে লাগল।সাধারণত ওদের দুজনের মধ্যে মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছিল। আদি চাইতো না যে এই ব্যাপারটা কেউ জানুক। কারন আরাধ্যা পরবর্তীতে কোনও সমস্যায় পড়ুক এটা সে চাইত না। কিন্তু আরাধ্যা ব্যাপারটাকে অন্যভাবে বুঝেছিল। তাই ওদের সম্পর্কটা শুরুর আগেই শেষ হয়ে গেল। তাই তারপর থেকে অন্য কোনও মেয়ের দিকে তাকাতে ভরসা পায় না আদি।

চোখেমুখে জল দিয়ে কামরায় ফিরে এল আদি। সে দেখল মেয়েটি বসে আছে।খোলা জানালা দিয়ে বাইরের সূর্যদয়ের অপরূপ দৃশ্য দেখছে হয়তো।নির্মল বাতাসে তার পিঠের ওপর একরাশ কালো চুল এক অদ্ভুত নৃত্যে দুলে চলেছে। বাসন্তী রঙের শাড়িতে মেয়েটাকে খুব সুন্দরই লাগছিল।যদিও মুখটা দেখার সৌভাগ্য আদির এখনও হয়নি।আদির আলাপ জমাবার কোনও ইচ্ছেই নেই। কারন আদি জানে পথের পরিচয় পথেই শেষ হয়ে যায়।আদি নীরবে শরৎচন্দ্রের 'শ্রীকান্ত' উপন্যাস খুলে বসল।

inside train


এবার আরাধ্যার কথাতে আসা যাক। হ্যাঁ আদির সহযাত্রী আরাধ্যাই। আদি তো ওকে ভালভাবে দেখেইনি।তাই চিনতেও পারেনি। আর আরাধ্যা স্কুল লাইফে একটু মোটা ছিল,এখন পুরো যাকে বলে পারফেক্ট।আরাধ্যা সদ্য লাল রঙা সূর্যের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল। ভাবছিল আদির কথা,ফেলে আসা দিনের কথা। এখনো একটুও বদলায়নি আদি।ঠিক যেমনটি ছিল তেমনটিই আছে।অবশ্য সে নিজেকে অনেকখানি পাল্টে ফেলেছে। এতটাই যে আদি ওকে চিনতে পর্যন্ত পারেনি।

হয়তো আরাধ্যার থেকে বেশি আদিকে আর কেউ ভালবাসতে পারবেনা।সেদিন রাত্রে আদি তার মায়ের ফোনে ফোন না করলে হয়তো সে ওই ভুলটা করত না।সেদিন সবার সামনে আদি বলেছিল যে,আর কোনওদিন সে আরাধ্যাকে ডিসটার্ব করবে না।তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ পাঁচটা বছর।আদি তার কথা রেখেছে।হয়তো কোনওদিন খোঁজ নেওয়ার চেষ্টাও করেনি।বড্ড জেদী আর বুদ্ধিমান আদি।বান্ধবীরা ওর সামনে আমার নাম তুললে ও আর পাঁচটা ছেলের মত ব্যাপারটা এড়িয়ে যেত না। এমন একটা রিয়াক্ট করত যেন কিছুই হয় নি।আর আরাধ্যা সে তো গোপনে আদির খোঁজ নিত। তাহলে আদি কি পুরো ব্যাপারটা ভুলে গেছে? আমাকেও ভুলে গেছে?নাকি প্রিয়জনের প্রবল আঘাতে জর্জরিত হৃদয়ে ভাল থাকার অভিনয় করে চলেছে। কে জানে?

এই একটাই ছেলে যার মনের তল কোনও মেয়ে আজও খুঁজে পায়নি। আদি তো ইচ্ছে করলে অনেক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে পারত।আদি কি তাহলে এখনও তাকেই ভালবাসে?আরাধ্যা আদিকে তখনও যেমন ভালবাসতো এখনো ভালবাসে।শুধু একটা ভুলের জন্য পুরো গল্পটা পাল্টে গেল।ফেসবুকে একবার ফেইক আইডি দিয়ে প্রোপোজও করেছিল আদিকে।কিন্তু আদি তো সেই প্রস্তাব গ্রহন করলই না।উল্টে তাকেই তার প্রেম কহিনী শুনিয়ে দিল।অদ্ভুত ভালবাসা আদির।

আরাধ্যা সামনে তাকিয়ে দেখে আদি পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে।চোখের কোন থেকে একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ছে। মুখটা শান্ত। আরাধ্যা কি কাছে গিয়ে একবার ডাকবে?না-না।কি অধিকার তার আছে?ডুকরে কেঁদে উঠল আরাধ্যা। সম্ভবত চাঁপা কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল আদির। এদিক ওদিক তাকিয়ে খানিকক্ষণ পর বুঝতে পারল তার সহযাত্রী কাঁদছে।হঠাত্ কি এমন ঘটল যে সে কাঁদছে? এখন আদি কি করবে?কি করা তার কর্তব্য?বুঝতে পারছে না সে।এরকম পরিস্থিতির মধ্যে আগে কখনো পড়তে হয়নি তাকে।অবশেষে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলবে বলে এগোল।

--এই যে শুনছেন।
নামটাও জানা হয়নি। নিজের গালেই নিজে একটা থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে হচ্ছে।
--হ্যালো মিস -----।
--(আরাধ্যা সমানে কেঁদে চলেছে)নিরুত্তর
--হঠাত্ কি হল? কাঁদছেন কেন?
--নিরুত্তর(কান্না চলছে)
--কোনও ব্যাড নিউজ শুনেছেন নাকি?
-- না।(মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল)

আদি এখনো আরাধ্যার মুখ দেখেনি । খোলা চুল সমস্তটাই সামনে এসে মুখটাকে আড়াল করে রেখেছে। আরাধ্যা কোনওমতে কান্না থামিয়ে সামনের চুল গুলো সরাল। হু হু করে ট্রেন ছুটে চলেছে।কিন্তু এ কি দেখছে আদি।নিজের য চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে।তার সামনে আরাধ্যা বসে আছে।ছিটকে দুরে সরে গেল আদি । আরাধ্যা অশ্রুসিক্ত চোখে আদির দিকে চাইল।প্রকৃতিস্থ হতে আদির কিছুক্ষণ সময় লাগল।তারপর ধীরে ধীরে বলল--

--গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে আবার মিলিত হলাম। কিন্তু আমি তো এটা চাইনি।অপছন্দ যখন। দুরেই থাকতে চেয়েছিলাম।
-- একটুও বদলাসনি তুই।বরাবরের মতোই বাইরে যা দেখলি তাই বিশ্বাস করে নিলি।একবারও মনটাকে পড়ার চেষ্টা করলি না।এই পাঁচটা বছর জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে হৃদয়। একটিবারো বোঝার চেষ্টা করলি না।
--বিয়ে করেছিস?
--হ্যাঁ করেছি।(কাঁদতে কাঁদতে)
--হাজবেন্ড নিশ্চয়ই খুব ভাল হয়েছে।জানিস আমি প্রত্যেকদিন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতাম যেন তুই একটা ভাল জীবনসঙ্গী খুঁজে পাস।তুই যেন সুখে থাকিস।
--আর তোর নিজের জন্য কিছু চাইতিস না?
-- না কারন আমার পাওয়ার মত তো আর কিছুই নেই।
-- কাঁদতে লাগল আরাধ্যা।
-- আচ্ছা তুই এত কাঁদছিস কেন বলতো?তোর হাজবেন্ড লটকে গেল নাকি?
-- না । ও মরলেও অমর হয়ে থাকবে।
-- আরেব্বাস। থ্যাঙ্ক ইউ বস। ঈশ্বর আমার ডাক শুনেছে। তোর হাজবেন্ড নিশ্চয়ই কোন গন্যমান্য লোক?
-- হ্যাঁ। ও অনেক বড় মানের ব্যক্তি।
-- আচ্ছা তোর হাজবেন্ডের নামটা কি?
-- আদি।
--হ্যাঁ বল।
-- আমার হাজবেন্ড এর নাম আদি।

চমকে উঠল আদি। না । এটা অসম্ভব। এসব সিনেমায় সম্ভব। বাস্তবে নয়।হিসেবগুলো সব গুলিয়ে যাচ্ছে তার।
-- আরাধ্যা মনে হচ্ছে তুই সাময়িক অসুস্থ হয়ে পড়েছিস। একটু রেস্ট নে।
-- না রে আদি আমি ঠিক আছি। এতদিন ই অসুস্থ ছিলাম। আজ আমি সম্পূর্ণ সুস্থ।
-- তাহলে এসব উল্টোপাল্টা বলছিস কেন?
-- একদিন এই উল্টোপাল্টা কথাগুলো শোনার জন্যই। আমার দিকে তাকিয়ে থাকতিস । রাত্রে মায়ের ফোনে ফোন করতিস।
-- ওসব কৌশরের পাগলামি। যৌবনের বাস্তবতার কাছে যা মূল্যহীন। ওসব কথা না বলাই ভাল নয় কি!
-- আদি আমি ছোটবেলা থেকেই অনেকটা শান্ত প্রকৃতির। চাহিদাও ছিল কম।মানসিক চাহিদা বেশি থাকলেও। মুখ ফুটে কিছু বলতাম না। তাই সখের জিনিসগুলোও পেতাম না। এই অভ্যাসের জন্য আমি অনেক জিনিস হারিয়েছি।কিন্তু আর হারাতে চাই না।
-- এসব কথা আমাকে কেন বলছিস?
-- ( বাধা দিয়ে)কারন আমি তোকে ভালবাসি আদি। সেই সেদিন থেকে। যেদিন আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, পড়ার ব্যাচের সামনে সেই আম গাছটার নিচে।( আনমনে বলে চলছিল আরাধ্যা)
-- আরাধ্যা আজ তুই বিবাহিতা। এসব কথা তোর মনের থেকে ঝেড়ে ফেলে দে।
-- কে বলল আমি বিবাহিতা? আমার তো এখনো বিয়ে হয়নি।

আবার চমকাল আদি।

-- তবে গভীরভাবে ভাবলে (আরাধ্যা বলল) বিয়ে আমার হয়েছে। তোর সাথে। তোকে আমি প্রথমদিন থেকেই পতি বলে মেনে নিয়েছি। কল্পনায় হয়েছে আমাদের মালাবদল। জানিস অনেক বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে দিয়েছি শুধুমাত্র তোকে পাবার আশায়। "ভালোবাসার মানুষটির জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করা যায়।" এটা তুই বলতিস। তো তুই যদি আমার জন্য অপেক্ষায় থাকতে পারিস তাহলে আমি কেন পারব না?

ট্রেনের কামরাটা পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গেল।শুধু ট্রেন চলার শব্দটাই শোনা যাচ্ছে।আরাধ্যা চোখ মুছে উঠে এল আদির কাছে আদিও উঠে দাড়িয়েছিল ।
-- আমি যে তোকে ভালবাসি আদি। তুই ছাড়া অন্য কাউকে আমি কল্পনায়ও আনতে পারি না।

couple


আরাধ্যা প্রবল আবেগে আদিকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছিল। কিন্তু বাধা দিল আদি।
-- আজ নয় আরাধ্যা। আমাদের প্রেম কাহিনী যখন নতুন পথে মোড় নিয়েছে। যখন সত্যের পবিত্রতার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে। তখন ক্ষনিকের আবেগে তাকে কলুষিত করে কি লাভ? এই সব ছোট্ট আবেগ না হয় জমাই থাক সেই রাতটির জন্য।
আরাধ্যা ঝুঁকে আদিকে প্রনাম করল।

আদি আরাধ্যাকে তুলে তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। আর চোখের জলটা আলতো করে মুছে দিল।

Post a Comment

0 Comments